তামাক গ্রাস করছে খাদ্যশস্যের জমি

লুৎফর রহমান, বরিশাল।

বোরোর বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়নি কৃষক। সরকার ধান ও চালের দাম নির্ধারণ করে দিলেও কৃষকের লোকসান গুনতে হয়েছে। এর পেছনে ছিল উচ্চমূল্যের সার, কীটনাশক, বীজ, সেচ ইত্যাদি। এবার আমাদের কৃষির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই সারের দাম অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। সম্প্রতি আরেক দফা সারের দাম কমানো হয়েছে। কৃষিঋণ যেখানে কৃষকের কাছে সোনার হরিণ ছিল সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী আজ তা প্রাšি-ক পর্যায়ের চাষির নাগালে। কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ভতুর্কি দেওয়া হচ্ছে। মোটকথা, কৃষিকে ভালবেসে সকল কৃষক যাতে এগিয়ে আসে সে ব্যবস্থাই করছে সরকার। নানামুখী সুযোগ-সুবিধা দেবার পরও বোরো চাষের পরিবর্তে দেশের অনেক জেলায় হচ্ছে তামাক চাষ। একরের পর একর খাদ্যশস্যের আবাদি জমি চলে যাচ্ছে তামাক চাষের দখলে। এটি সত্যি আতঙ্কের কথা। শস্যভাণ্ডার চলনবিল অঞ্চলের পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ; নাটোরের গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার ১ হাজার একর জমিতে হচ্ছে তামাকের আবাদ। কৃষকরা জানায়, কৃষি কর্মকর্তারা সিগারেট কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে গোপনে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহ দিচ্ছে। তারা আরো জানায়, তামাক চাষে তাদের তেমন কোন খরচ নেই। সার, বীজ ও কীটনাশকের খরচসহ নানা সুযোগ-সুবিধা কোম্পানিই তাদের দিয়ে থাকে। কুষ্টিয়ার মিরপুর, দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলায় তামাক আবাদি এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ। বর্তমানে ৩০ হাজার একর জমিতে আবাদ হচ্ছে নানা জাতের তামাক। এখানে প্রত্যেক বাড়িতেই তামাক পোড়ানোর ঘর আছে।

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কক্সবাজার জেলার মাঠ-ঘাট, পাহাড়-পর্বত, গহিন অরণ্যেও হচ্ছে তামাক চাষ। মাতামুহুরী নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় নদীর তীর ছেড়ে তলদেশেও তামাক চাষ করা হয়েছে। এ জেলার চকরিয়া, রামু, বান্দরবানের লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অরণ্যঘেরা এলাকায় এখন তামাকের সরব উপস্থিতি। পাশাপাশি সংরক্ষিত বনের পাহাড়ের ঢালে ও নিচু জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি বনের গাছ কেটে বাড়ানো হচ্ছে তামাক চাষের এলাকা। এ এলাকার ৭৫ ভাগ জমিতেই চলে গেছে তামাক চাষের দখলে। বান্দরবানের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, এ অঞ্চলে ২ হাজার ৩১২ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে।

তামাক চাষের চেয়ে তামাক প্রক্রিয়াজাত করতে পরিবেশের ক্ষতি হয় বেশি। প্রতি তিন একর জমির তামাকপাতা পোড়াতে একটি চুলি¬র দরকার হয়। চুলি¬তে সাতবার আগুন দিতে হয়। প্রতিবার আগুন দিতে লাগে ২৫ মণ লাকড়ি। এ অঞ্চলে তামাকপাতা প্রক্রিয়াজাত করতে এক থেকে দেড়’শ চুলি¬ বসানো হয়েছে, আর এ চুলি¬তে লাকড়ির যোগান দিতে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল।

মুন্সিগঞ্জেও শুরু হয়েছে তামাকের আবাদ। এ অঞ্চলকে সবাই সবজি ও আলু উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে চিনলেও এখন পরিচিত হচ্ছে তামাক চাষ এলাকা হিসেবে। রাজবাড়ী জেলার কালুখালী ও এর আশপাশের কিছু অঞ্চল জুড়ে ফসলি ক্ষেত চলে যাচ্ছে তামাক চাষের আগ্রাসনে। কক্সবাজার, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর,কুষ্টিয়া, রংপুর, রাজবাড়ী, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে ধানের এই মৌসুমে শুরু হয়েছে তামাকের চাষ। উর্বরা জমি ক্ষতিগ্র¯- হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে ও মানুষের দেহে ঢুকছে নানা রকমের অসুখ-বিসুখ। ১ বিঘা জমিতে ধান আবাদে প্রয়োজন হয় সর্বোচ্চ ৩০ কেজি ইউরিয়া। আর এক বিঘা জমিতে তামাক আবাদে প্রয়োজন হয় কমপক্ষে ১’শ কেজি ইউরিয়া, দেড়’শ কেজি পটাশ, টিএসপি ও অন্যান্য সার। সরকারের ভর্তুকি দেওয়া সারের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে তামাক চাষিদের ঘরে। অতিরিক্ত সারের এই ধকল মাটি সইতে না পেরে কয়েক বছর পরই হয়ে যায় বন্ধ্যা। তখন আর এই জমিতে কোন ফসল ফলে না। বলাই বাহুল্য, বিপুল পরিমাণ এই সারের জন্য কৃষককে মোটেও দুশ্চিš-া করতে হয় না। সার পৌঁছে দেয়া হয় কৃষকের ঘরে। তামাক চাষিদের অনেকেই বিশ্বাস করে, খাদ্যশস্য, সবজি কিংবা ডাল ফসল আবাদের ক্ষেত্রে উপকরণের এই নিশ্চয়তা থাকলে তাদের তামাক আবাদে যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। প্রাšি-ক চাষিদের সঙ্গে তাদের সš-ানের ভবিষ্যৎও আটকে যাচ্ছে তামাকের ভেতর। তামাকের মৌসুমে এলাকার শিশুরা স্কুল না গিয়ে তামাক বাছাইয়ের কাজে জড়িয়ে পরে।

তামাক চাষের পেছনে রাসায়নিক সার আর শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার হয়। শুধু তাই নয়, চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কয়েকটি প্রক্রিয়ায় মানুষের শরীরে ঢুকছে বিষ। এসব ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টির কোন ব্যবস্থা নেই। তামাক গাছের কচি ডগা ভেঙে তাতে ঢেলে দেয়া হয় উচ্চ মতাসম্পন্ন বিষ। তামাক পাতার বাণিজ্যিক মানের কথা ভেবেই কোম্পানিগুলো শিখিয়েছে এই রীতি। কিন্তু তারা শেখায়নি ভয়াবহ কীটনাশক থেকে শরীর রক্ষার কোন কৌশল। প্রতিনিয়তই কৃষকরা কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় ক্ষতিগ্র¯- হচ্ছে। তামাক চাষ এলাকায় মানুষের শরীরে চুলকানি, হাঁপানীসহ শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘরে ঘরে তামাকপাতা পোড়ানোর বিষাক্ত ধোঁয়া নানাভাবে ঢুকে যাচ্ছে শিশুদের শরীরেও। আবাদি এলাকাগুলোতে নেই জনস্বাস্থ্য রক্ষার কোনই ব্যবস্থা। তামাক চাষ, বাছাই, কৃষকের ঘরে প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা তামাকজাত প্রোডাক্ট হিসেবে বিড়ি-জর্দা ইত্যাদি তৈরি করাÑ এই কাজগুলো কখনো সাধারণ চাষবাস কখনো ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবেই গণ্য হয়ে আসছে কৃষকের কাছে। কার্যত ক্ষতিকর হলেও ক্ষতির তথ্যটি কখনোই পৌঁছে না ওইসব প্রাšি-ক মানুষের কাছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কিংবা উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিড়ি তৈরির কারখানাগুলো নিশ্চিত করছে অসংখ্য নারীপুরুষ শিশুর কর্মসংস্থান। নাকমুখ খোলা রেখে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ওই কাজে নিয়োজিত তারা। সেখানে জীবনের যত ঝুঁকিই থাক না কেন, নিয়তি হিসেবে তারা যেন নীরবেই মেনে নিচ্ছে সবকিছু। এই শ্রমিকদের মতই আবাদি এলাকার কৃষকরাও জেনে গেছে, মানবদেহের মতই মাটি, পরিবেশ এবং জীব-বৈচিত্রে নীরবে এক ধ্বস নেমে চলেছে। যেভাবে খাদ্যশস্য আবাদের জমিতে ছোবল বসাচ্ছে তামাক, তার পরিণতি একদিন নিরুপায় এই প্রাšি-ক চাষিদেরকেই ভোগ করতে হবে। সরকার জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের কথা চিš-া করে ২০০৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনকে আরো গতিশীল করতে ২০০৬ সালে আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে আইনটি ৫ বছরে পদার্পণ করেছে যা বা¯-বায়নে সারাদেশে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে তা দ্বারা ১ কোটি মানুষের পুষ্টিহীনতা লাঘব করা যাবে। তাই বিপুল সংখ্যক জনসাধারণকে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য চাষ ও ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে সরকারসহ দেশের আপাময় জনসাধারণ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেবে ১০০০ টন তামাক উৎপাদনে ১০০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০০ সালের গবেষণায় দেখা যায়, তামাক ও ধূমপানের কারণে প্রায় ৪২ লক্ষ লোক অপরিণত বয়সে মারা গেছে যার মধ্যে ৩৪ লক্ষ পুরুষ এবং ৮ লক্ষ মহিলা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে প্রতিবছর মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ লক্ষ। যে কোন ধরনের তামাকজাতদ্রব্য আমাদের মুখ গহবরকে আক্রাš- করতে পারে। সিগারেট জাতীয় দ্রব্যে রয়েছে ৪ হাজার রকমের রাসায়নিক পদার্থ এবং গ্যাস। যার মধ্যে ২৮ ধরনের পদার্থ ক্যান্সার বৃদ্ধিতে সহায়ক।  দিন দিন বাড়ছে তামাকের আবাদ। এ আবাদে দেশের উর্বরা মাটি তামাক চাষে বন্ধ্যা হয়ে অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত সার, কীটনাশকের ভার মাটি বেশি দিনে সইতে পারবে না। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কৃষির প্রতি গুরুত্ব দিলেও তামাক চাষ বন্ধের দিকে দিতে হবে আরো বেশি গুরুত্ব।