Published On: Sun, Aug 6th, 2017

ভূমিদস্যুদের হাতে জিম্মি আগৈলঝাড়ার অর্ধশতাধীক কৃষক পরিবার

Share This
Tags

 

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি
মিন্টু হালদার, নিত্যানন্দ জয়ধর, খোকন জয়ধরের নেতৃত্বাধীন একদল  ভূমিদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফেনাবাড়ি ও আন্ধার মানিক গ্রামের অর্ধশতাধীক নিরিহ কৃষক পরিবার।
সরেজমিন ঘটনাস্থল ঘুরে প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া বর্ননা ও ভূক্তভোগীদের অভিযোগে জানাগেছে, ওই ভূমিদস্যুরা ভয়-ভীতি দেখিয়ে গত চার বছর ধরে ওই দুটি গ্রামের ৫০-৫৫টি নিরিহ কৃষক পরিবারের ৪০ একরের অধিক চাষের জমি গায়ের জোরে দখল করে মাছের ঘের বানিয়ে তাতে মাছ চাষ করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ঘটনার প্রতিবাদ করায় হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়েছে ফেনাবাড়ি গ্রামের শেফালী গুপ্ত (৪৫) নামের এক গৃহবধুর ওপর। থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার পায়নি ভূক্তভোগীরা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকার দু পক্ষই এখন সেখানে মুখোমুখী অবস্থানে রয়েছে। যে কোন সময় তাদের দু পক্ষের মধ্যে ঘটে যেতে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অথবা জীবনহানীর মত মারাতœক কোন অঘটন।
আন্ধার মানিক গ্রামের কৃষক অনিল চন্দ্র হালদার অভিযোগ করেন, ঘের তৈরী করা হয়েছে ৪ বছর হল, ঘেরের ভেতরে আমার ১ একর ৫৬ শতক জমি রয়েছে। প্রথম বছর ইরি-বোরো মৌসুমে তারা আমার জমিটি চাষ দিয়ে দিয়েছিল। এ ছাড়া গত ৪ বছরে ঘেরের ভেতরে আমার জমি ব্যাবহার বাবদ আমাকে তারা কিছুই দেয়নি। এমন কি মাছ ধরে বিক্রির সময় একদিনের খাবারের মাছও দেয়নি। তিনি বলেন, গত ৪ বছর পূর্বে মিন্টু হালদার, নিত্যানন্দ জয়ধর, খোকন জয়ধরের নেতৃত্বে যখন আমাদের দুই গ্রামের চাষের জমিকে মাছের ঘেরে রুপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয় তখন আমরা বলেছিলাম জমির পরিমান অনুযায়ী জমি মালিকদের যাকে যে সুবিধা আপনারা দিবেন তার আলাদা আলাদা চুক্তি করে নিন। তারা চুক্তি করার আশ্বাস দিয়ে ঘের তৈরীর কাজ শুরু করে। ঘের তৈরীর পর নানা তালবাহানা করে চার বছর কাটিয়ে দিয়েছে। কারো সাথে কোন প্রকার চুক্তি না করে সবার জমি জবরদখলে নিয়ে গায়ের জোরে মাছ চাষ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একই অভিযোগ করেন ওই গ্রামের পূর্নশশী জয়ধর ও ফেনাবাড়ি গ্রামের বীরেন গুপ্ত।
ফেনাবাড়ি গ্রামের অশোক গুপ্ত অভিযোগ করেন, ওই ঘেরের ভেতরে আমাদের গুপ্ত বংশের প্রায় ২০ জন জমি মালিকের সাড়ে ৮ একর জমি রয়েছে। গত চার বছরে ঘেরের উদ্যোক্তারা আমাদের কারো জমিতে এক বার, কারো জমিতে ২বার চাষ দিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া আমাদেরকে কোন প্রকার টাকা পয়সা তারা দেয়নি। এমন কি একদিনের খাবারের মাছও দেয়নি আমাদের পরিবারকে। এ কারনে আমাদের বংশের ওই ২০জন জমি মালিকরা একত্রিত হয়ে চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে ঘেরের উদ্যোক্তাদের জানিয়ে দেই যে, আমরা আর ওই ঘেরের জন্য জমি দেব না।
এরপর আমরা গুপ্ত বংশের ২০জন জমি মালিক একত্রিত হয়ে একটি চুক্তি করে ঘনফাসের নেট (জাল) দিয়ে নিজেদের সাড়ে ৮ একর জমিকে ঘেড়া দিয়ে একটি মাছের ঘের তৈরী করে চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতে সেখানে নানা প্রকার মাছের চাষ করি। গত ২রা জুলাই দুপুর ১২টার দিকে প্রতিপক্ষ মিন্টু হালদার, নিত্যানন্দ জয়ধর, খোকন জয়ধর ও তাদের সহযোগীরা আমাদের ঘেরের উত্তর অংশের নেট খুলে ফেলে আমাদের চাষকৃত মাছ পার্শ্ববর্তি ঘেরের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। ঘটনা দেখতে পেয়ে আমার মা শেফালী বেগম ডাক-চিৎকার দিলে সন্ত্রাসী ভূমিদস্যুরা আমার মায়ের ওপর হামলা চালায়। তারা আমার মাকে পিটিয়ে ও নির্যাতন চালিয়ে আহত করে। এ ঘটনায় আমি আগৈলঝাড়া থানায় মামলা দিতে গেলে থানার তৎকালীন ওসি মোঃ মনিরুল ইসলাম মামলার এজাহার না নিয়ে আমাকে দিয়ে একটি জিডি লিখিয়ে রাখেন। সে দিন যদি পুলিশ তাৎক্ষনিক মামলা নিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যাবস্থা নিত, তাহলে আমাদেরকে আর ভূমিদস্যুদের এত উৎপাত সইতে হতনা। পুলিশ দ্রুত ব্যাবস্থা না নেয়ায় চিহ্নিত ওই ভূমি দস্যুরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
একই বাড়ির সুরেশ গুপ্ত অভিযোগ করেন, গত ১২ জুলাই বেলা ১১টার দিকে পূর্নরায় তারা আমাদের নেট খুলে ফেলে অবশিষ্ট মাছ পাশের ঘেরে নেয়ার চেষ্টা চালায়। আমি দেখে ডাক-চিৎকার দিলে আমাদের বাড়ির লোকজন এগিয়ে আসে। ফলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ ঘটনায় আমি নিজে বাদি হয়ে ১৫ জনকে বিবাদী করে গত ১৮ জুলাই বরিশাল বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা মেজিষ্ট্রেট অদালতে ফৌজদারী কার্য়বিধি আইনের ১৪৪/১৪৫ ধারায় একটি মামলার আবেদন করি। বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে বিরোধীয় ভূমিতে শান্তি শৃংখলা রক্ষার ব্যাবস্থাসহ সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আগৈলঝাড়া থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলা করায় তারা এখন আমাদেরকে একের পর এক হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। হুমকিদাতারা বলে বেড়াচ্ছে সময় সুযোগ মত তারা আমাদের ঘের জবর দখল করতে আসবে। কেউ বাঁধা দিলে তাকে খুন করে ফেলবে। ফলে এখন আমাদের চরম আতংকের মধ্যে দিন কাটছে।
ভূক্তভোগীরাসহ স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান, ঘেরের জমি ও মাছ জবর দখলকে কেন্দ্র করে যে কোন সময় সেখানে দু পক্ষের মধ্যে ঘটে যেতে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। অথবা ঘটতে পারে কারো জীবনহানীর মত মারাতœক কোন অঘটন।
আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আদালতের নির্দেশে ওখানে শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার জন্য উভয় পক্ষকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। কেউ যদি কাউকে হুমকি দিয়ে থাকে আর সেটা আমাদের কাছে প্রতিয়মান হয়, তা হলে অবশ্যই আমরা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা নেব।

About the Author

-

%d bloggers like this: