Published On: Mon, Jul 31st, 2017

স্নানের উপকারিতা

Share This
Tags

শান্ত পথিক//   এস এম রহমান হান্নান স্টাফ রিপোর্টার

চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধুলো। সঙ্গে জীবাণুর রাজত্ব। এমন অবস্থায় শরীর, মন, মেজাজ, স্বাস্থ্য ঠিক রাখা বেজায় কঠিন। তবে এই কাজটিকেই সহজ করে দিতে পারে স্নান। কিন্তু কীভাবে? কথা বললেন ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট আয়ুর্বেদিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ডাঃ প্রদ্যোৎবিকাশ কর মহাপাত্র।

• স্নান ব্যাপারটা আসলে কী?
•• স্নান এক ধরনের থেরাপি। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক চিকিৎসা। এক্ষেত্রে জল আর অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিস দিয়ে শরীর পরিষ্কার করা হয়। স্নান করলে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়। শরীর চনমনে থাকে। পরিচ্ছন্নতা এবং সৌন্দর্য এই দুটি শব্দ স্নানের সঙ্গে যুক্ত। শরীর তরতাজা ও রোগমুক্ত রাখতে স্নানের জুড়ি নেই। এই প্রসঙ্গে শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘মল নির্মোচনং ক্রিয়া জলস্নানং দিনে দিনে।’ এখানে তিন রকমের মলের কথা বলা হয়েছে— ঘাম, মল এবং মূত্র। ‘মলিনীকরণাৎ ইতি মলঃ’— অর্থাৎ যা শরীরকে মলিন করে রাখে, তাকেই মল বলে। আর শরীর থেকে এই জাতীয় পদার্থ বের করে দিতে স্নানের ভূমিকা অপরিহার্য। নিয়মিত স্নান না করলে শরীর প্রয়োজনীয় জল পায় না। ফলে কষে গিয়ে ইউরিনে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকী পায়খানাও কষে যায়। শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সুস্থ শরীর আর সতেজ মনের জন্য নিয়মিত স্নান জরুরি।
• তাহলে স্নান এক ধরনের রিফ্রেশমেন্ট?
•• অবশ্যই। চরক সংহিতায় বলা হয়েছে, পবিত্রং বৃষ্যম্‌ আয়ুষ্যং শ্রমস্বেদমলাপহম্‌/শরীর বলসন্ধানং স্না্নম্‌ ওজষ্করং পরম্‌। যার তর্জমা হল— স্নান অত্যন্ত পবিত্র এবং আয়ুবর্ধক। স্নান ক্লান্তি দূর করে। শরীরের বল বাড়ায়। এমনকী বিশেষ বিশেষ রোগ প্রতিরোধ করে। ঠিকমতো স্নান করলে ইন্দ্রিয় সতেজ হয়ে ওঠে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব নিয়মিত স্নান করা শুধু রিফ্রেশমেন্ট নয়, তার সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও মেলে—
 প্রতিদিন স্নান করলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ভালো থাকে। ব্লাডপ্রেশার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
 পেশি নমনীয় থাকে। স্নায়ু সতেজ থাকে।
 স্নান ত্বকের কোমলতা, আর্দ্রতা ধরে রাখে। ত্বকের রোগ প্রতিরোধ করে।
 শরীর থেকে টক্সিন দূর করে।
 নিয়মিত স্নান করলে শরীরের বিভিন্ন ব্যথা, জ্বালা-যন্ত্রণা কম থাকে।
 প্রয়োজনীয় জল পেলে রোমকূপের মুখ খুলে যায়। স্বাভাবিকভাবে ঘাম নিঃসরণ হয়।
 ঠিকমতো স্নান করলে পর্যাপ্ত ঘুম হয়। ইনসমনিয়ার সমস্যায় ঘুমোনোর আগে স্নান করা খুব উপকারী।
 মাথাব্যথা কমাতেও স্নানের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
 এছাড়া মানসিক চাপ, টেনশন, ডিপ্রেশন, রাগ কমাতে স্নান অত্যন্ত উপযোগী।
• স্নানের কি কোনও রকমফের আছে?
•• হ্যাঁ আছে। মূলত দু’ধরনের স্নান হয়। ১. অবগাহন স্নান, ২. ধারা স্নান। নদ-নদী, পুকুরে গা ডুবিয়ে স্নান করাই হল অবগাহন।
মুশকিল হল, গ্রামের দিকে এই সুবিধে থাকলেও শহরে এই অবসর প্রায় নেই বললেই চলে। তবে সুইমিং পুল, বাথটবে স্নান অবগাহনের উদাহরণ। আবার ঝর্ণা, শাওয়ার, বালতি থেকে জল ঢেলে স্নান ধারা স্নানের পর্যায়ভুক্ত।
এছাড়া সূর্যস্নানের কথা বলা যায়। এর আরেক নাম আতপ স্নান। দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা কমাতে সরাসরি সূর্যের আলো মেখে চিকিৎসা করা হয়।
• কেমন জলে স্নান করতে হবে?
•• খুব ঠান্ডা অথবা খুব গরম জলে স্নান করা একেবারেই চলবে না। এতে তেমন আরাম নেই। বরং অতিরিক্ত ঠান্ডা বা উষ্ণ জল অন্যান্য বিপত্তি ডেকে আনতে পারে। তাই স্নানের জল হবে নাতিশীতোষ্ণ। এতে যেমন আরাম বোধ হয়, তেমন উপকারও পাওয়া যায়। শরীর ও মন চাঙ্গা থাকে। তবে কোনও কারণে ঠান্ডা লাগলে, অসুখ হলে, বাতের সমস্যা বাড়লে এ নিয়মে কিছুটা অন্যথা হতে পারে। তখন ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করা যায়। তবে তা অভ্যাস করলে হবে না। অতিরিক্ত গরম জল কখনওই নয়। এতে কাজের কাজ হয় না। বরং স্নানের আগে হাতে হালকা তেল মেখে নিলে বেশ উপকার পাওয়া যায়।
• দিনে কতবার স্নান করা উচিত?
•• গরমকালে দিনে দু’বার স্নান করা উচিত। এতে ঘামের সমস্যা কমে। শরীর তরতাজা থাকে। এর বেশি দরকার নেই। তবে স্নানের আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। না হলে অন্যান্য উপসর্গ দেখা যেতে পারে। প্রথমত, ঠান্ডার ধাত আছে কি না মাথায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, যখন তখন স্নান করা যাবে না। তৃতীয়ত, রোদ থেকে ফিরে এসেই গায়ে জল ঢালা অত্যন্ত ক্ষতিকর। শীতকালে একবার স্নানই যথেষ্ট। তবে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যাই হোক, নিয়মিত স্নান জরুরি।
• কোন সময়ে স্নান করা দরকার?
•• আগেই বলেছি স্নান এক ধরনের প্রাকৃতিক চিকিৎসা। এতে অনেক রোগের নিরাময় হয়। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্নান করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। তবেই এর সুফল পাওয়া যাবে। বিশেষ করে সকালে। তখন প্রকৃতি, শরীর এবং জলের তাপমাত্রা প্রায় সমান থাকে। একরকম ভারসাম্য তৈরি হয়। তাই এই সময় স্নান করাই সবথেকে ভালো। এতে এনার্জি বাড়ে। শরীর চনমনে থাকে। বেলা বাড়লে তাপমাত্রারও হেরফের হয়। সেই সময় স্নান করলে ঠান্ডা, সর্দি-কাশি, জ্বরসহ অন্যান্য উপসর্গ দেখা যেতে পারে। তাই প্রতিদিন সকালে, নির্দিষ্ট সময়ে স্নান করা দরকার।
• কতক্ষণ স্নান করতে হবে?
•• এটা বেশ মজার প্রশ্ন। সত্যি বলতে বেশিরভাগ লোকের স্নানের ধরাবাঁধা সময় নেই। কেউ দু’মগ জল ঢেলেই বেরিয়ে আসেন। কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে থাকেন। এতে বিশেষ উপকার কিছু নেই। বরং অতিরিক্ত জল ব্যবহার করলে সর্দি কাশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার পর্যাপ্ত জল না পেলে শরীর কষে যায়। তাই সবকিছু বিবেচনা করে স্নানের জন্য পাঁচ থেকে দশ মিনিট যথেষ্ট।
• সদ্যোজাত শিশুকে কীভাবে স্নান করাতে হয়?
•• সদ্যোজাত শিশুকে কনকনে ঠান্ডা বা খুব গরম জলে স্নান করানো একেবারেই নিষেধ। ওদের অ্যামবলিক্যাল কর্ড শুকিয়ে গেলে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট স্নান করানো উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো বডি ওয়াশ, হেয়ার ওয়াশ ব্যবহার করলে ত্বকের সংক্রমণ আটকানো যায়।
• স্নানের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম আছে কি?
•• অবশ্যই আছে। আগেই বলা হয়েছে নাতিশীতোষ্ণ জলে স্নান করতে হবে। স্নানের আগে হালকা তেল মালিশ করলে উপকার পাওয়া যায়। নিয়মিত সাবান দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশের ময়লা পরিষ্কার করতে হবে। এতে শরীর জীবাণুমুক্ত হয়।
স্নানের পরেই গা মুছে ফেলতে হবে। নরম গামছা অথবা তোয়ালে নিংড়ে গা মুছতে হবে। শুকনো, খরখরে গামছায় ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়। সব শেষে শুকনো জামাকাপড় পরে বেরতে হবে। ভেজা গায়ে বাইরে এলে তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাতে রোগযন্ত্রণা বাড়তে পারে।
• স্নান থেকে কী কী উপকার পাওয়া যায়?
•• অনেক উপকার পাওয়া যায়—
 ঠিকমতো স্নান করলে শরীর ফুরফুরে থাকে। মন টেনশনমুক্ত হয়।
 শরীর থেকে সমস্ত রোগজীবাণু ধুয়ে যায়। তাতে সংক্রমণের আশঙ্কা কমে।
• অক্লান্ত পরিশ্রমের পর স্নান করলে হার্ট বিট, শ্বাসপ্রশ্বাসের হার স্বাভাবিক থাকে। রক্ত চলাচল ভালো হয়। ফলে মানসিক চাপ, ক্লান্তি, অবসাদ কমে যায়।
• স্নান করলে খুব ভালো ঘুম হয়। শরীর ঝরঝরে থাকে। তবে স্নান করার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমালে চলবে না। এতে কিন্তু ক্ষতি হয়।
• সারাদিন কাজের ফলে শরীরের টিস্যুগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্নানের মাধ্যমে সেগুলি আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
• জয়েন্টের ব্যথায় কমবেশি অনেকেই ভোগেন। একটানা বসে কাজ করলে অনেকের ঘাড়ে, কাঁধে যন্ত্রণা হয়। শোওয়ার দোষেও এই সমস্যা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত স্নান ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

About the Author

-

%d bloggers like this: