প্রাকৃতিক ক্ষমতা সম্পন্ন গ্যানোডারমা মাশরুম ক্যান্সার নিরাময়ে সৌভাগ্যময় ঔষধী

Share This
Tags

((মুহম্মাদ আহছান উল্লাহ)) =
আল্লাহতায়ালা মানব জাতির কল্যাণে দুনিয়ায় অগণিত জিনিসের সৃষ্টি করেছেন। এরকম কোটি কোটি সৃষ্টির মধ্যে মানব দেহের জন্য খুবই উপকারী ও ঔষধি গুণে ভরপুর একটি দ্রব্যের সহজ-সরল নাম মাশরুম। এই মাশরুম মানুষের কি কাজে লাগে? মাশরুম এমন একটি ছত্রাক যার মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার পুষ্ঠি এবং ঔষধি গুণ ।
পৃথিবীতে প্রায় আটত্রিশ হাজার প্রজাতির মাশরুম রয়েছে এর মধ্যে দুইহাজার প্রজাতির মাশরুম খাবার যোগ্য বাকীগুলো বিষাক্ত এই দুই হাজারের মধ্যে দুইশত প্রজাতি ঔষধি গুণ সম্পন্ন। পৃথিবীর অনেক দেশে এই মাশুরুমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গুণাগুণের ভিত্তিতে এই মাশরুমের কদর এক এক দেশে একেক রকম ঔষধি গুণ সম্পন্ন মাশরুমের মধ্যে একটি মাশরুমের নাম গ্যানোডারমা বা রিশি মাশরুম জাপানীরা যাকে দেবতার শক্তি বলে অবিহিত করে আর চীনারা বলে লিংজি বা মৃত্যু প্রতিরোধক। চীনের ইতিহাসে যে মানব সমাজ হাজার বছরে যে দুঃসাহসিক যুদ্ধ কবেছেন তারা নিঃ সন্দেহে মহামানব। তাদের দুঃসাহসিক যুদ্ধে পেছনে গ্যানো ডারমার এক বিরাট প্রভাব রয়েছে ।
উজ্জল গ্যানোডারমা ছত্রাক আবিষ্কৃত হয়েছে দু হাজার বছর আগে। কি এমন মাহাত্ব্য লুকিয়ে আছে এর ভেতর? এই বৈচিত্রময় জীব জগতের পৃথিবিতে ফুলে ফেঁপে ওঠা নানা জাতের গাছ-গাছড়া রয়েছে, রয়েছে জীব জন্তুর রাজত্ব যা মানুয়েরই কাজে লাগে এবং রয়েছে বিশেষ করে এই ছত্রাকের রাজত্ব যা সব কিছু থেকেই আলাদা। প্রচুর প্রাকৃতিক ক্ষমতা সম্পন্ন এই গ্যানোডারমা সৌভাগ্যময় ঔষধী ।
চীনা বিজ্ঞানিরা অনেক গভীর গবেষনা করে এর গুনাগুণ সম্মন্ধে নিশ্চিত হন যে, এটা অনেক রোগ নিরাময়ে কাজ করে এবং অনেক তদন্ত ও গবেষনার পর এটা আর্ন্তজাতিক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। চীন, জাপান, দÿিন কোরিয়া এবং আমেরিকার বিজ্ঞানীরা গ্যানোডারমা গবেষনায় একটি এসোশিয়েসন তৈরি করেন। বিজ্ঞানীরা এই সিন্ধান্তে উপনীত হন যে, গ্যানোডারমার মধ্যে রয়েছে পলিসেকারাইড এবং ট্রাইডারপেনওয়েন যা মানুষকে আরোগ্য করার প্রধান উপাদান। এটা হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিকতায় ¯œায়ুতন্ত্রে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর কাজ করে। হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক স্পন্দনের হেরফের হলে কোলেস্ট্রলের কারণে রোগের আবির্ভাব হয়। হৃদপিন্ডে স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালনের অভাবে হৃদরোগ বা পক্ষাঘাতের মতো রোগের উৎপত্তি। অপুষ্টিজনিত কারণে মানবদেহের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় না থাকলেই দেহ যন্ত্রগুলো স্বাভাবিক কাজ করেনা এবং মানুষ রোগাক্রান্ত হয়। গ্যানোডারমা ট্রাইডারপেনওয়েন, কোলেস্টরেল কমিয়ে দেয় এবং সঠিক রক্ত সঞ্চালন বজায় রেখে রক্তের গিøসারিনকে সজীব করে যাতে হৃদরোগ সহ অন্যান্য রোগের প্রতিরোধ হয়। ঔষধ প্রস্তুত সংক্রান্ত পর্যবেক্ষনে দেখা গেছে গ্যানোডারমার বহুমুখী কার্যক্রম যা দেহের কেন্দ্রীয় ¯œায়ুতন্ত্রে কাজ করে অনিদ্রা থেকে শুরু করে বহুবিদ রোগ নিরাময়ে সহায়ক। গ্যানোডারমা কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই রোগ নিরাময়ে অদ্বিতীয়। আধূনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে গ্যানোডারমা একাই মানবদেহে স্বাভাবিক সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রেখে বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। মাশরুমকে ক্যান্সারের প্রতিরোধক এবং নিরাময়ক হিসেবে মনে করা হয়। মাশরুম যে ইমিউন সিস্টেমের জন্য খুবই উপকারী তাতে সন্দেহ নেই। ইমিউন সিস্টেম জীবের এমন এক ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া- যার মাধ্যমে দেহ যেকোনো রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে এবং ইউনিভার্সিটি অব স্টার্থক্লাইড জাপানি গবেষণা বিষয়ক একটি রিভিউ থেকে জানায় যে, বিশেষ প্রজাতির কিছু মাশরুম কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে এ বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে চায়। তারা তাদের ওয়েবসাইটে জানায়, বেশকিছু গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, মাশরুম রোগের প্রতিরোধে ইমিউন সিস্টেমে কাজ করে। এসব প্রমাণের কিছু নেওয়া হয়েছে জাপানের একটি গবেষণা থেকে। ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, একটি বিশেষ প্রজাতির মাশরুম রয়েছে যা খেলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। ওই ওয়েবসাইটে আরো বলা হয়, বেশ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মাশরুম তাদের ক্যান্সারের জন্য বেশ কার্যকর । দ্য গার্ডিয়ান মাশরুমের ক্যান্সার প্রতিরোধের বিষয়ে শক্ত মতামত তুলে ধরেছে। তারা এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে কীভাবে মাশরুম ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদনে ম্যাথু জেনকিন বলেন, মাশরুম শুধু সুস্বাদুই নয়, এতে আছে লেনটিনান যা অ্যান্টি-টিউমার হিসেবে পরিচিত পলিস্যাকারাউড। এটি ক্যান্সার রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ২০০৮ সালে চীনের হারবিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেন যে, লেনটিনান পলিস্যাকারাইড টিউমারের জন্য ভালো এবং তা বাঁচার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। মাশরুম নিয়ে ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে গবেষণা চালিয়েছে। তারা জানায়, এ মাশরুমের উপকারিতা নিয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। লেনটিনান হলো বিটা গ্লুকন। এটি ইমিউন সিস্টেমে কাজ করে এবং বেশ কিছু কোষকে প্রোটিন সরবরাহ করে ক্যান্সার প্রতিরোধ করার জন্য। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএনএএস) জার্নালে বলা হয়, এক দল গবেষক গ্যানোডার্মা মাশরুমের দ্বারা ক্যান্সার কোষ মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। গ্যানোডার্মা মাশরুম একটি এন্টিঅক্সিডেন্ট ধারণকারী উচ্চতর খাদ্য উপাদান যা স্তন ক্যান্সার, উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং মেদ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
গ্যানাডার্মা ছত্রাকের জগতে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ অবস্থান দখল করে আছে। এটি ভেষজ গুণ সম্পন্ন এক অনন্য সাধারণ মাশরুম। চীনা সংস্কৃতিতে এর রয়েছে প্রায় ২০০০ বছরের ইতিহাস । দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ও আধুনিক গবেষণায় জানা যায় যে, শরীরের স্বাভাবিক ও অসুস্থ উভয় অবস্থাতেই গ্যানোডার্মার সার্বিক উন্নতি ও দীর্ঘায়ু যোগান দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাই এটি সর্বাধিক সমাদৃত জীবন বাঁচাতে অতুলনীয়। গ্যানোডার্মা বা লাল মাশরুম হচ্ছে একটি উন্নত জাতের ঔষধী গুণ সম্পন্ন বিলুপ্ত প্রজাতির মাশরুম গ্যানোডার্মা বা লাল মাশরুমের মূল কাজ হচ্ছে ৩টি- ১। আমাদের দেহের জীবকোষ (যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে) সেল এর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরিণ সমস্ত ট্রক্সিন (বিষ) পরিস্কার করা। ২। আমাদের দেহের কোষ (সেল) এর ইমব্যালেন্স দুর করে সমতায় ফিরিয়ে আনা। ৩। আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে স্থায়ীভাবে রোগমুক্ত ও শক্তিশালী করে তোলা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দির্ঘ গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে যে একজন সুস্থ মানুষ অসুস্থ হওয়ার মূল কারণ উপরোক্ত তিনটি এবং খাদ্য অভ্যাস। তাই একজন মানুষ আজীবন সুস্থ রোগমুক্ত থাকার জন্য মাশরুম প্রধান ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকার জন্য সবার উচিত চর্বি, চিনি ও লবণ কম খাওয়া এবং আঁশ জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া। এ ক্ষেত্রে মাশরুম একটি আদর্শ খাবার। বিভিন্ন রোগব্যাধিতে মাশরুমের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। আসুন জানা যাক বিভিন্ন রোগে মাশরুমের উপকারিতা কি কি:
১. মাশরুমে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও মিনারেলের এমন সমন্বয় রয়েছে যা শরীরে “ইমিউনিটি সিষ্টেমকে” উন্নত করে। ফলে গর্ভবর্তী মা ও শিশুরা নিয়মিত মাশরুম খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয়।
২. মাশরুম চর্বি ও শর্করা কম থাকায় এবং আঁশ বেশি থাকায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের আদর্শ খাবার।
৩. মাশরুমে রয়েছে শরীরের কোলেস্টেরল কমানোর অন্যতম উপাদান ইরিটাডেনিন, লোভাস্টটিন এবং এনটাডেনিন। তাই নিয়মিত মাশরুম খেলে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
৪. মাশরুম আছ প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ডি,যা শিশুদের দাঁত ও হাড় গঠনে অত্যন্ত কার্যকর।
৫. মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিড ও লৌহ। ফলে মাশরুম খেলে রক্তশূণ্যতা দূল হয়। এছাড়া লিংকজাই-৮ নামক পদার্থ থাকায় এটি হেপাটাইটিস- বি জন্ডিসের প্রতিরোধক।
৬. মাশরুমে আছে বেটা-ডি, গ্লকেন, ল্যাম্পট্রোল, ট্রাইটারপিনওয়েড ও বেনরজাপাইরিন। যা ক্যান্সার ও টিইমার প্রতিরোধ করে।
৭. মাশরুমে ট্রাইটারপিন থাকাতে, বর্তমানে বিশ্বে এটি এইডস প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৮. মাশরুমে ইলুডিন এস থাকাতে আমাশয়ের উপকারী।
৯. মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে গ্লাইকোজেন থাকাতে শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। তাই যৌন অক্ষম রোগীদের জন্য মাশরুম একটি মহৌষধ।
১০. মাশরুমে এডিনোসিন থাকাতে এটি ডেঙ্গু জ্বরের প্রতিরোধক।
১১. মাশরুমে স্ফিঙ্গলিপিড এবং ভিটামিন বি-১২ বেশি থাকায় নার্ভ ও স্পাইনাল কর্ড সুস্থ রাখে। মাশরুম খেলে উচ্চ রক্তচাপে দূর হয়, মেরুদন্ড দৃঢ় থাকে।
১২. এত প্রচুর পরিমাণে এনজাইম আছে, যা হজমে সহায়ক, রুচিবর্ধক ও পেটের পীড়া নিরাময়ক।
১৩. এতে নিউক্লিক এসিড ও এন্টি এলার্জেন থাকায়, কিডনি ও এলার্জি রোগের প্রতিরোধক।
১৪. মাশরুমে প্রচুর পরিমাণ সালফার সরবরাহকারী এমাইনো এসিড থাকায় নিয়মিত প্রহণে চুল পড়া ও চুল পাকা প্রতিরোধ করে।
এছাড়াও মাশরুমে যথেষ্ট পরিমাণে আঁশ থাকায় শরীর স্লিম রাখার জন্য অত্যন্ত উপকারী। যারা শরীরকে স্লিম ও কর্মক্ষম রাখতে চান তাদের নিয়মিত মাশরুম খাওয়া উচিত। খাদ্য হিসেবে মাশরুম অতুলনীয়।

About the Author

-

%d bloggers like this: