Published On: Wed, Nov 1st, 2017

আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

Share This
Tags

বাংলাদেশ ! ছোট্ট একটি দেশ । ছোট হলেও বাংলাদেশের যে পরিমান ইতিহাস আর ঐতিহ্যে ভরপুর রয়েছে । খুব কম দেশেরই তা রয়েছে । এক সময় পুরো বাংলাদেশ বিভিন্ন খন্ড খন্ড অংশে বিভক্ত ছিল । প্রচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না । ঐতিহাসিকগণ মনে করেন খ্রিষ্টপূর্ব দেড় হাজার অব্দে বাংলার প্রাচীনতম সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । এ সভ্যতাটি গড়ে উঠেছিল অজয় নদীর দক্ষিণ তীরে । অশোকের রাজত্বকালে পুণ্ড্র জনপদ মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল । গুপ্ত যুগে প্রায় সারা বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল । গুপ্ত শাসনের অবসানের পর বাংলায় দুটো স্বাধীন রাজ্যের বিকাশ ঘটে । এদের একটি উত্তর-পশ্চিম বাংলার গৌর রাজ্য । অপরটি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বঙ্গরাজ্য । এরপর প্রায় একশ বছরের বিশৃঙ্খলার পর পাল বংশ ক্ষমতায় আসে । পাল বংশের পতনের পর সেন বংশের রাজত্ব শুরু হয় । সেন বংশের রাজত্বের অবসানের পর মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ।অজ্ঞতা, অনাচার আর হানাহানিতে ডুবে যাওয়া আরব ভূমিতে আবির্ভাব ঘটে ইসলামের । ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত মোহাম্মদ (স.) । নবীর মৃত্যুর পর খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে । খলিফাগণ নতুন প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্য পরিচালনার জন্য একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন । মুসলিম আধিপত্য সম্প্রসারনে যে অভিযান শুরু হয় তার ফলে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুদেশ জয় করেন । এভাবে ভারত বর্ষে মুসলমানদের আগমনের পথ তৈরি হয় । এর প্রায় তিনশ বছর পর গজনীর সুলতান মাহমুদ ভারত আক্রমণ করেন ।

দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে মুহাম্মদ ঘুরী ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহ অধিকার করেন এবং উপমহাদেশে আফগান শাসনের ভিত্তি দৃঢ় করেন । ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাংয় স্বাধীন সুলতানী শাসনের অবসান হয় । মুঘল সম্রাট হুমায়ুন শেরশাহের অধিকার থেকে গৌড় দখল করে নিলেও তা ধরে রাখতে পারেননি । হুমায়ুনের পরাজয়ের পর বাংলা-বিহার অঞ্চল আফগানদের প্রত্যক্ষ্ নিয়ন্ত্রণে চলে যায় । তাদের মধ্যে দুই বংশের শাসকরা এ সময় বাংলার ক্ষমতায় আসে । শেরশাহ ও তাঁর উত্তরাধিকারীরা ছিলেন শূর বংশের । পরবর্তী শাসকেরা ছিলেন কররানী বংশের । কররানী বংশের শাসক দাউদ খানের হাত থেকে মুগল সম্রাট আকবর বাংলা কেড়ে নেন । সূত্রপাত ঘটে বাংলায় মুঘল শাসনের । কিন্তু আকবরের শাসনামলে মুঘল অধিকার বাংলার উত্তর-পশ্চিম এলাকাতেই সীমিত ছিল । পূর্ববঙ্গ সহ বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে অনেক স্বাধীন জমিদার ছিল যারা মুঘল শাসন সহজে মেনে নেয়নি । তাঁদের বলা হতো বার ভূঁইয়া । তাঁরা মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন । আকবরের সেনাপতিরা তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযান পরিচালনা করেন । কিন্তু তাঁদের দমন করা সম্ভব হয়নি । শেষ পর্যন্ত সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান বার-ভূঁইয়াদের চুড়ান্তভাবে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন । ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয় । তারপর ত্রয়োদশ শতক হতে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল । এসময় সুলতানী আমলে বাংলা কখনো দিল্লীর অধীন এবং কখনোবা স্বাধীন ছিল । ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের সময় হতে বাংলায় স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয় । ইলিয়াস শাহী শাসনামলে সারা বাংলা একত্রিত হয় । মুঘল আমলে বাংলা তাঁর স্বাধীনতা হারায় এবং মুঘলের একটি প্রদেশে পরিণত হয় । বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা এদেশের সমাজ, সাংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করে । হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ে নতুন সমাজ কাঠামো গড়ে উঠে । সাংস্কৃতিক জীবনেও এসময় পরিবর্তন সুষ্পষ্ট । এসময় বাংলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয় । বাংলা ভাষা ও সাহত্য নিজস্ব অবয়ব লাভ করে । দৈন্যতা কাটিয়ে ওঠে বাংলার অর্থনৈতিক জীবনে সমৃদ্ধির সুবাতাস প্রবাহিত হয় । কৃষি, শিল্প ও বানিজ্যে বিপুল অগ্রগতির ফলে জনজীবনে স্বচ্ছলতা, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় । কিন্তু এ সুখ-শান্তি খুব বেশিদিন টিকলো না । বাংলার প্রাচুর্যের উপর থাবা বসাল ভিনদেশি হায়নারা । ইংরেজরা এদেশকে খুড়ে খুড়ে খাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো । ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় বাংলায় ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে । তবে পলাশীর বিজয়ে কোম্পানীর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি । বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় কোম্পানীকে আরো কিছু ধাপ যথা- বক্সার যুদ্ধ, দিউয়ানী লাভ এবং দ্বৈত শাসন ইত্যাদি অতিক্রম করতে হয় । পলাশীর যুদ্ধের পর বঙ্গ-ভারতের রাজনৈতিক ও সাধরণ জনজীবনে বিরাট পরিবর্তন আসে । এদেশের অার্থ-সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রেই নেমে আসে অবক্ষয় । এসময় বাংলার আর্থ-সামাজিক ভিত্তি ভেঙ্গে পড়ে । তবে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার, ইউরোপের সৃষ্টিশীল চিন্তাধারার আমদানী, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, স্থানীয় শাসন প্রবর্তন ইত্যাদির ফলে আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় । এসময় পাশ্চাত্য ভাবধারায় উজ্জীবিত কতিপয় মনীষীর প্রচেষ্টায় বঙ্গ-ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে পূনর্জাগরনের ঢেউ জাগে । ভারতীয়দের মধ্যে নতুন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবাদর্শ সৃষ্টিতে যারা অনন্য ভূমিকা পালন করেন, তন্মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নওয়াব আব্দুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য । পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবধারার প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি নানা কারণে উনবিংশ শতাব্দীর শেষাধ্যে ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে । ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস গঠনের মধ্যে এ চেতনা সুষ্ঠুরূপ ধারণ করে । কংগ্রেস ছিল একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল । হিন্দু-মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের জন্য এ দলের দ্বার উন্মুক্ত থাকলেও মুসলমান প্রথম থেকেই কংগ্রেসের সাথে সংস্রব এড়িয়ে চলে । এর কারণ প্রথমতঃ এ সময় ভারতে হিন্দু পুণরুত্থানবাদী আন্দোলনের উন্মেষ এবং বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী দয়ানন্দ, বলগংগাধর তিলক প্রমুখের হিন্দু বিদ্বেষী প্রচারণা ও কর্মকান্ডে মুসলমানরা ক্ষুদ্ধ এবং সংকিত ছিল । দ্বিতীয়তঃ জাতীয় কংগ্রেস থেকে মুসলমানদের দূরে সরিয়ে রাখে মুসলিম নেতৃবৃন্দের নীতি । এসময় সৈয়দ আহমদ খান প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দ কংগ্রেসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং মুসলমানদের কংগ্রেস যোগদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান । মুসলিম নেতৃৃবৃন্দ কর্তৃক বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থায় তাদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখা এবং চাকুরী ও শিক্ষার অধিকারসহ সর্বত্র আলাদাভাবে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টার ফলে তাদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র চেতনা ও বোধের জন্ম হয় । লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করা হয় । বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ব বঙ্গ ও আসামের সংখ্যা গরিষ্ট মুসলমানরা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখে । কিন্তু বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও বর্ণ হিন্দুদের আন্দোলন এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ মুসলমানদের স্বতন্ত্র চেতনাবোধকে আরো শানিত করে । এই স্বাতন্ত্রবোধের ফসল ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ গঠন এবং মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের জোর দাবী । বিংশ সতাব্দীর সূচনাতেই ভারতের রাজনীতিতে পরিবর্তন ধারার সূত্রপাত হয় । এসময় ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যের রাজনীতিতে ভাটা পড়ে । ভারতীয়দের মধ্যে স্বার্থ চেতনা ও অধিকারবোধ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে । ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর ইংরেজদের প্রতি মুসলমানদের আস্থা ও বিশ্বাস ভঙ্গ হয় । নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য তারা হিন্দুদের সহযোগিতার পথে পা বাড়ায় । এ সময় ভারতের স্বরাজ অর্জনকে ভারতের মুসলমানরাও তাদের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষনা করে । শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে লক্ষৌ চুক্তি নামক এক যৌথ দাবী নামা স্বাক্ষরের মাধ্যমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ঐক্য প্রক্রিয়ার সূচনা করে । খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে ঐক্য প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয় । ব্যাঙ্গল প্যাক্ট ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপনের আরেক ধাপ অগ্রগতি । তবে এর পরেই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় । ভারতের রাজনীতিতে পুনরায় হিন্দু-মুসলিম বিভেদ বিসংবাদের কাল থাবা সম্প্রসারিত হয় । ফলে বৃটিশ ভারতে রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকট দেখা দেয় । শাসনতান্ত্রিক সংকট সমাধানের লক্ষ্যে বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সাইমন কমিশন গঠন এবং গোল টেবিল বৈঠক সহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় । ভারতীয়দের উদ্যোগে নেহরু রিপোর্ট, জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’ ইত্যাদিও সংকট নিরসনে ব্যর্থ হয় । ম্যাকডোনাল্ডের সাম্প্রদায়িক বোয়েদাদে সংকট আরো ঘনিভূত হয় । এমতাবস্থায় ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রণীত হয় ।

About the Author

-

%d bloggers like this: