Published On: Sat, Oct 28th, 2017

বিনোদন আর শৈশববিহীন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়

Share This
Tags

কক্সবাজার শহর থেকে সিএনজি অটোরিকশাতে উখিয়ার বালুখালি যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টার মতো। এই বালুখালিরই বিভিন্ন পাহাড়ের ওপরে ও পাদদেশে রোহিঙ্গারা অস্থায়ী আশ্রয় শিবির তৈরি করে সেখানে ঠাঁই নিয়েছে। আশ্রয় শিবিরে থাকা মানেই বেঁচে থাকার অবিরাম যুদ্ধ। সারাদিন ত্রাণের জন্য ছোটা আর ত্রাণ পেলে সেটি নিজের অস্থায়ী আবাসে রেখে আসা- এভাবেই চলছে রোহিঙ্গাদের জীবন সংগ্রাম। কিন্তু একজন মানুষের সারাটা দিন-রাত তো কেবল ত্রাণের খোঁজেই কাটে না। বাকিটা সময় তারা আসলে কিভাবে কাটায়? অথবা মিয়ানমারেই থাকাকালীন রোহিঙ্গারা কাজ শেষে বা অবসরে আসলে কি করতো সেটি জানার আগ্রহ থেকেই মূলত উখিয়ায় যাওয়া।

একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা পাঁচটি-খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। এর বাইরেও অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হলো চিত্তবিনোদন। এই বিনোদন মানে যে কেবল টিভি দেখা বা খেলাধূলা করা সেটি নয়। বরং, নিজের মনকে প্রফুল্ল রাখার জন্য একজন মানুষ যেটি করে সেটিই তার চিত্তবিনোদন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জীবন এতটাই সংগ্রামময় যে, তারা জানেই না চিত্তবিনোদন কি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরেজমিন ঘুরে এ ধারণাই প্রকট হলো যে, রোহিঙ্গা শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার জীবন থেকে ‘চিত্তবিনোদন’ শব্দটাই আসলে হারিয়ে গেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী-পুরুষের কথা না হয় বাদই দিলাম, তাদের ছোট সন্তানরাও কেমন যেন বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। একত্রে খেলা করার শৈশবটাও যেন তারা ভুলে গেছে।

রোহিঙ্গা শিশুরা জানে না একসঙ্গে খেলাধূলার কথা। তারা একত্রে বেড়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু সেই বেড়ে ওঠাটা যেন একাকিত্বের। ঘরের বাইরে কয়েকজন কিশোর বা তরুণের দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করাটাও সেখানে অপরাধ। হয়তো মিয়ামারের ক্ষমতাসীন সরকার ভয় পায়, তরুণদের একতাবদ্ধতাকে। এ বিষয়টি তাই ছোট ছেলেমেয়েদের ওপরও এফেক্ট করেছে। তারা জানেই না সবাই মিলে খেলা করা যায়, আড্ডা দেয়া যায়। ইচ্ছে হলেই দলবেঁধে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায় কিংবা গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়া যায়, সেটাই বা কে তাদেরকে শেখাবে। বড়দের দেখেই যেখানে ছোটরা শেখে সেখানে বড়দের নিজেরই তো শিক্ষা নেই। ছোটদের তারা শেখাবে কি করে।

তবে রোহিঙ্গা যুবক জান্নাতুল বারী জানালো, ২০১২ সালের আগে যারা স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৮ম বা ৯ম শ্রেণিতে পড়তো তারাই গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাদের নিজ উদ্যোগে শিক্ষা দেয়।

তাহলে রোহিঙ্গাদের জন্য গ্রামে কি কোনোই শিক্ষা ব্যবস্থা নেই? উত্তরে বারী জানালো, আছে। তবে সেটি কেবলই ধর্মীয় শিক্ষা। বৌদ্ধ না হলে বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সেখানে নেই।

কিন্তু একই দেশে এতো ভিন্নতা কেন? এটা জানতে ফিরে যেতে হবে ২০১২ সালে। সে বছর মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম ও বৌদ্ধ রাখাইনদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। সেই দাঙ্গা শুরু হয় জাতিগত কোন্দলকে কেন্দ্র করে এবং উভয় পক্ষই এতে জড়িত হয়ে পড়ে। আর এরপর থেকেই মূলত রোহিঙ্গা মুসলিমরা জাতিগতভাবে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাদের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন নেমে আসে। সর্বশেষ নিজ দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতন ও হত্যার শিকারের প্রেক্ষিতে দেশ ছাড়তে শুরু করেন রোহিঙ্গা মুসলিমরা। এ পর্যন্ত এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। আশ্রয় নিয়েছেন টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে।

বালুখালির রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া ২৪ বছরের যুবক আলম জানালেন, মিয়ানমারে থাকতে তারা কেবল কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। কাজের বাইরে চিত্ত বিনোদনের বিষয়টি ভাবাও তাদের জন্য অলীক ছিল। গ্রাম থেকে শহরে যেতেন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বা বিক্রি করতে। সেখানকার দোকানে বসে টিভি দেখবেন সেটি তারা চিন্তাও করতে পারতেন না। এ কারণে বাংলাদেশে এসেও তাদের মনে কখনো টিভি দেখা বা আড্ডা দেয়ার চিন্তাও জাগে না। তবে তিনি এটাও স্বীকার করলেন সারাদিন তো আর ত্রাণের জন্য দৌড়ান না। ত্রাণ নিয়ে ঘরে ফিরে বাকি সময় আসলে কিছুই করার থাকে না। নিজেরা ঘরের মধ্যে বসে সাংসারিক আলাপ করেন। বাচ্চারা বিক্ষিপ্তভাবে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। এভাবেই তাদের দিন কেটে যায়।

মিয়ানমারের ভূঁইচর গ্রামের অধিবাসী আনোয়ার বেগম বললেন, বাচ্চারা কিভাবে খেলবে? তারা তো কোনোদিন কোথাও কাউকে খেলতেই দেখেনি, যেটি দেখে তারা খেলাধূলা করা শিখবে। ঘরের মধ্যে মাঝেসাঝে কাঁদামাটি দিয়ে বাচ্চারা একা একাই খেলতো। কিন্তু বাইরে যেয়ে তাদের খেলার বিষয়টিই যেন অলেখা নিষেধাজ্ঞার মাঝে আবদ্ধ ছিল।

এসব কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা যেমন তাদের শৈশবকে হারিয়েছে, তরুণরাও হারিয়েছে স্বপ্ন। স্বপ্নবিহীন বঞ্চিত একটি জাতি হিসেবে রোহিঙ্গারা এখনো জানে না তাদের এই দুঃস্বপ্নের শেষ কোথায়।

About the Author

-

%d bloggers like this: