Published On: Mon, Feb 22nd, 2021

সুস্বাস্থ্যের সরল পথ (১৮তম পর্ব)

Share This
Tags
মোঃ আহছান উল্লাহ।
পাশ্চাত্যধারায় বিকশিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি কম হয়নি। নতুন নতুন ওষুধ চিকিৎসার নব্য কাণ্ডারীতো অনেক ধাপ এগিয়ে— অভিজ্ঞতার সিঁড়িতে ধাপে ধাপে। তবু রোগস্বাস্থ্য ও শরীর নিয়ে অনেক কিছু জানার বাইরে, নাগালেরও বাইরে। এর মধ্যে যদি কেউ ‘ফোক মেডিসিন’ অর্থাৎ লোক চিকিৎসা এবং প্রাচীন ধারায় ‘ট্রাডিশনাল মেডিসিন’ অর্থাৎ আযুর্বেদী ও ইউনানী চিকিৎসার কথা বলি তাহলে হয়ত অনাগ্রহ দেখাবেন। কিন্তু মজাটা হল উপমহাদেশে সনাতনী চিকিৎসার যথেষ্ট চাহিদা ও কদর বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে।তবে ব্যতিক্রমও আছে।
কিছুকাল আগে আমেরিকায়সহ উন্নত দেশগুলোতে খুব ঝোঁক দেখা গিয়েছিল— ‘ন্যাচারাল ফুড’ ন্যাচারাল ‘ট্রিটমেন্ট’ নিয়ে। তবে এর মধ্যে উল্লোখযোগ্য ডি. গ. জার্ভিস নামে একজন পেশাজীবী চিকিৎসকের লেখা বই ‘ফোক মেডিসিন’ ঐতিহাসিক তথ্য ও আপন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। তাতে রয়েছে লোক চিকিৎসার অনেক জারিজুরি কথা। বইটি আবার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘বেস্ট সেলার’ তবে লোক চিকিৎসার গুণমান বা মূল্যমান আমি উড়িয়ে দেই না নানা ঘটনার অভিজ্ঞতার কারণে। কোনো কোনো দুঃশ্চিকিৎসা রোগ দেখা গেছে লোক চিকিৎসায় নিরাময় হতে। কখনো আয়ুর্বেদী কখনো ইউনানীতে। আবার এদের রমরমা ব্যবসাও সমাজে এদের প্রভাবের কথা বুঝিয়ে দেয়। লোক চিকিৎসার আরও একটি দিক আছে, যা ভেবে দেখার মতো। প্রত্যেক প্রাচীন সভ্যতার দেশেই দেখা যায়, প্রাকৃত চিকিৎসার ঐতিহ্য রয়েছে। পাহাড়ী এলাকায় বা সমতল ভূমি যেখানেই হোক লতাপাতা মূল কাণ্ডের ভেষজ গুণসহ গাছলতা ইত্যাদি চেনা-অচেনা ঔষধীর (ভেষজগুণ সম্পন্ন উদ্ভিদ) রয়েছে অস্তিত্ব। আর লোক চিকিৎসায় সেগুলোরই ব্যবহার হয়ে থাকে।
কত মূল্যবান ঔষধী যে প্রকৃতির কোণে লুকিয়ে আছে, কে তার খবর রাখে। লোক চিকিৎসাশাস্ত্রের কল্যাণে যেসব লতা ফুল, ফল, পাতা মূল ও কাণ্ডের ভেষজগুণের কথা আমরা জানি। প্রাচীন চিকিৎসা বিধির রক্ষণশীলতার কারণে বহু মূল্যবান ভেষজের পরিচয় হারিয়ে গেছে। এ ইতিহাস আবেগ বলে উড়িয়ে দেবার জো নেই, যখন আমরা দেখি বাগানের ভেতরে বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাগানের বাইরে যেখানে সেখানে ফুটে থাকা নীল-সাদা-বেগুনী নয়নতারা ফুল থেকে আধুনিক বিজ্ঞান উদ্ধার করতে পেরেছে লিউকিমিয়া নামক রক্ত-ক্যানসারের ওষুধ ‘ভিনক্রিস্টিন’ ভিনব্লাস্টিন’। অথচ এসব পশ্চিমা বেনিয়া ওষুধ কোম্পানি ঠিকই এ দেশের লতা-পাতা, কাণ্ড, মূল থেকে মূল্যবান ওষুধ তৈরী করে প্রচুর মুনাফা লুটেছে। যেমন সর্পগন্ধা থেকে সিবা তৈরী করেছিল উচ্চরক্তচাপ রিরোধক, সেডেটিভ ওষুধ— ‘সারপাসিল’-এক সময় দেদার বিক্রি হয়েছে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের দাক্ষিণ্যে। যাদের এসব লোক ওষুধে আগ্রহ আছে তারা জানেন এ দেশে শহরে-গ্রামে ঝোপে-জঙ্গলে লতিয়ে ওঠা তেলাকুচা পাতার রস মানবদেহে রক্ত শর্করা কমাতে কার্যকর ওষুধ। ডায়াবেটিসে রক্তশর্করা কমাতে কার্যকর লতাপাতা জাতীয় ভেষজ এ দেশে অনেক। তবে গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাল হেপাটাইটিসের (যকৃত প্রদাহের) বিরুদ্ধে কার্যকর শাদামাটা অড়হর গাছের পাতার রস সাধারণ মানুষ হরহামেশা ভাইরাল জন্ডিসে ব্যবহার করে থাকে। এমন একটি সুলভ মূল্যবান ঔষধী নিয়েও আমাদের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানের কোনো গবেষকের আগ্রহ দেখা যায়নি। কেন? এমন মুনাফা-স্ফীক স্থানীয় ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তাদেরও একটি আবিষ্কারের দিকে নজর পড়েনি। প্রাচীন শাস্ত্রে এমন অনেক কার্যকর ঔষধী নাম মিলবে। আসলে আমাদের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী প্রবণতার বড় অভাব। অনাসক্তি গবেষণাকর্মে, শ্রম ও সময় ব্যবহারে। পাটের জেনোম আবিষ্কার বা অনুরূপ দু’-চার জন হয়ত ব্যতিক্রম। ডা. জার্ভিস ‘ফোক মেডিসিন’ তথা লোক চিকিৎসা বলতে ‘প্র্রাকৃতিক চিকিৎসা’ বোঝাতে চেয়েছেন। তার তত্ত্বগত বিচারে আমাদের আদি পূর্বপুরুষ প্রাচীন প্রকৃতির সঙ্গে থেকে প্রকৃতির বিরূপতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আবার প্রকৃতির আশীর্বাদী উপাদানের ওপর নির্ভর করেই অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করেছে।
আধুনিক মানুষ সেসব প্রাকৃত উপকরণের সহপানিভ্য চিকিৎসার সহায়তা নিতে পারে, যা প্রকৃতিগতভাবে তার দেহ ব্যবস্থার অনুকূল। তার বিবেচনায় আমরা প্রাণীজগতের আচরণ থেকে আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধের অনেক বিধিবিধান জানতে পারি মনোযোগী পর্যবেক্ষণে। তার বিচারে প্রাণীকুলের জৈবনিক হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী মানুষের জীবন সময়কাল তথা আয়ু ন্যূনপক্ষে শতবর্ষ হওয়া উচিত। আর সেটা প্রাকৃত পরিবেশের জীবনযাপনে সম্ভব। সম্ভব শতবর্ষীর সুস্থ-সক্রিয় জীবনযাপন। অবাক হয়েছি একই রকম তথ্য আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার বরাতে জেনে যে, মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের সময়-সীমা ১০০ থেকে ১২০ বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে পারে। অবশ্য এখানেও একই শর্ত— তা প্রতৃতির নিবিড় সাহচর্যে বসবাস। কৃত্রিম নাগরিক জীবনযাপনের নানা চাপ তাপে তা বিঘ্নিত হয়। আমরা স্মরণ করতে পারি, রবীন্দ্রনাথ তার ‘ছিহ্নপত্রাবলী’ থেকে একাধিক লেখায় প্রাকৃত সৌন্দর্যের পরিবেশে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। কথাটা সত্য, কৃত্রিম খাদ্য উপকরণ, কৃত্রিম দূষিত পরিবেশ দীর্ঘায়ুর অনুকূল নয়। (চলবে)।

About the Author

-

%d bloggers like this: