নৈতিক সমাজ

Share This
Tags

ড.মোঃ আবদুল কাইয়ুম
আধুনিক সমাজ জীবনে শিক্ষার বিকল্প নেই। আধুনিক শিক্ষাই সমাজের উন্নতির মল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ
করেছে এবং করছে। কিন্তু শত উন্নতি হলেও সমাজে কিংবা দেশে কি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? বর্তমানে প্রচলিত
আধুনিক শিক্ষা সমাজের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করলেও সমৃদ্ধি কিন্তু দিতে পারেনি। এই যে বাঙালি সমাজের
একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থা ভাঙ্গার ক্ষেত্রে আমাদের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার দায় রয়েছে অনেকাংশে। আধুনিক
শিক্ষা ব্যবস্থায় একক পরিবারের ধারণা লালন পালন করা হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। তাতে সমাজ অর্থনৈতিকভাবে
উন্নতির পথে ধাবিত হলেও মানবিকতার ক্ষেত্রে যে উল্টো পথে হাটছে তা বলাই বাহুল্য। আজকের একক পরিবার
আমাদের যতটা না দিয়েছে; তার থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক বেশি। এ একক পরিবার যে আমাদের সমাজ
এবং শিক্ষা ব্যবস্থারই সৃষ্ঠ সেটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এটা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থারই বাই প্রোডাক্ট।
পাঠ্যপুস্তকের পরতে পরতেও উঠে এসেছে এ একক পরিবারের কন্সেপ্ট। করোনার এ কঠিন বাস্তবতার সময়
সন্তানকে পড়ানোর সময়ও দেখলাম এ বিষয়। সেখানে আমাদের সন্তানরা কীভাবে একান্নবর্তী পরিবারের ধারণা
পাবে? প্রতিটি শিশুই দাদা দাদী চাচা ফুপুর সঙ্গ পছন্দ করে, তাদের সাথে থাকতেও চায়। সেটার সুযোগ আমরা
কতজন সন্তানদের জন্য করে দিতে পারছি। আমরা আজকে We Feelings এর পরিবর্তে I Feelings এর
তত্ত্ব এবং তথ্যে মত্ত্ব। যা আজ সমাজব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতীয়মান। সেখানে মানবিকতার অবস্থান খুজে
পাওয়া একটু হলেও কষ্টকর হয়ে পড়ছে। আমরা যদি বড়ো বড়ো মনীষীর দিকে তাকাই তাহলে সবারই
মানবিকতার দিকটাই বড়ো আকারে চোখে পড়ে। আর তারা সে মানবিকতা দিয়েই মানব হৃদয়ে অমর স্থান করে
নিয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংযোজন ঘটাতে হবে তাদের সে মানবিকতা সমৃদ্ধ গল্প। সংযোজন করতে
হবে; শিক্ষকের কাছে আব্রাহাম লিংকনের (১৮০৯-১৮৬৫) চিঠি, হজরত ওমর (রা.) এর বিভিন্ন মানবিক গল্প,
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঝড়ের রাতে মায়ের ডাকে বাড়িতে আসা, বায়েজেদ বোস্তামীর পানি নিয়ে মায়ের জন্য
সাড়া রাত দাড়িয়ে থাকার মত বিষয়গুলো। যা আমাদের সন্তানদেরকে পাঞ্জেরির মত মানবিকতার পথ দেখাবে।
আমাদের সন্তানরা কীভাবে বেড়ে উঠবে? সমাজের পরবর্তী রূপরেখা কী হবে? এ সবই নির্ধারণ করে রাষ্ট্র।
আমাদের এ ঘে ণ ধরা সমাজব্যবস্থাকে যে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ার সময় এসেছে তা আমাদেরকে প্রতিদিনের
সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যা আমাদের
বিবেককে কি নাড়া দিয়ে যাচ্ছে না? ব্যস্ততার যাত্রায় ধাবমান থাকা অবস্থায় সেটা এতদিন দেখার সুযোগ না
পেলেই, করোনা আমাদেরকে সেটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। করোনা আমাদের শরীরকে আবদ্ধ করলেও মনের
জগতকে উন্মুক্ত করেছে। অনেকেই বলছেন ৫০তম ধরিত্রী পালন ( ২২.০৪.২০২০) করতেই করোনা এসেছে।
মানুষকে আবদ্ধ করে প্রকৃতিকে দিয়েছে নতুন রূপ। ‘এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি- নবজাতকের
কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-৪৬) এ বাণী আমরা বুঝতে না পারলেও প্রকৃতি তার
নিজ দায়িত্বেই বুঝি নিয়েছে বার দায়িত্ব। প্রকৃতির সাথে আমাদেরকেও বুঝতে হবে। আমরা যে ২০৩০ সালের
মধ্যে Sustainable Development Goals (SDGs) এর কথা বলি সেটাকে বাস্তবায়ন হয়ত যান্ত্রিক মানব
দিয়ে হবে না ভেবেই দায়িত্ব নিয়েছে প্রকৃতি নিজেই। আল্লাহর সৃষ্ট ১৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ একটি
মাত্র প্রজাতি। আরও যে ১৭৯৯৯ প্রজাতি পৃথিবীতে বসবাস করে। তাদেরও যে বাঁচার অধিকার আছে; সেটা
আমরা হয়ত ভুলেই গিয়েছিলাম। করো বাংলাদেশ গড়ার ভিশন নির্ধারণ করেছে। যার সুফল কিন্তু আমরা পাচ্ছি। আজকে এ কঠিন পরিস্থিতি
মোকাবেলায় তা কতটা সহয়তা করছে। তা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে বিভিন্নভাবে। আমরা
অনলাইনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা, মিটিং, শিক্ষা, বাজারসহ দৈনন্দিন কত কার্যই না সমাধান করছি। সরকার
যদি গুণগত শিক্ষার সাথে একটি শব্দ সংযোজন করে গুণগত মানবিক শিক্ষার ভিশন হাতে নিত তাহলে আমরা
আজকে সর্বত্র মানবিকতার জয়গান দেখতে পেতাম। সমাজকে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, গুম,
ক্রশফায়ার, দুর্নীতি, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক, মানব পাচার, মাদকতা, অবিচার, ভেজাল সামগ্রী উৎপাদন,
বিষাক্ত খাবার, ইয়াবা; এগুলোর মুখোমুখি হতে হত না। আমাদের সন্তানদেরকে শেখাতে হবে জেতার মধ্যে আছে
শান্তি আর জেতানোর মধ্যে আছে প্রশান্তি। শান্তির চেয়ে প্রশান্তি অনেক শ্রেয়। সেখানে আছে মানবিকতা। আমরা
যারা মা-বাবা; আমাদেরকেও সন্তানকে মানবিক হওয়ার জন্য শিক্ষা দিব। আমরা আমাদের মা-বাবা, ভাই-বোনের
প্রতি দায়িত্ব পালন করে তাদেরকে বাস্তবতার মধ্য দিয়ে মানুষ করে তুলব। তাদের মস্তিষ্কের মধ্যে মানবিকতার
বীজ বপন করে দিব। যারা একদিন সমাজে বায়েজিদ বোস্তামী (৮০৪-৮৭৪), আবদুল কাদের জিলানি (১০৭৮-
১১৬৬), হাজী মুহম্মদ মহসিন (১৭৩৩-১৮১২), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) মত মহীয়ান হয়ে
সমাজকে আলোকিত করবে। আমরা সন্তানকে আর্থিকভাবে উন্নত হওয়ার শিক্ষা দিই মানবিকভাবে বেড়ে উঠার
শিক্ষা দেই কতজন? সময় এসেছে আলোকিত মানুষ গড়ার । সমাজ, জাতি আজকে খ্্্্ুঁঁঁঁজছে সাদা মনের
মানুষদের। যারা কথায় না; কাজে বিশ্বাস করে। কুসুমকমুারী দাশ (১৮৭৫-১৯৪৮) এটা ভেবেই হয়ত উনিশ
শতকে লিখে গেছেন। ‘ আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে;’। বর্তমান
সমাজের প্রচারমুখী মানবিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচারিত হবে তাদের কথা যারা মানব
জাতির জন্য কাজ যাচ্ছে ভুবনে ভুবনে, গোপনে গোপনে। মানুষকে বোঝাতে হবে মানুষ মানুষের জন্য। তাকে
কোনোভাবেই কষ্ট দেওয়া যাবে না। মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাস (১৩৭০-১৪৩৩) এর ‘সবার উপরে মানুষ সত্য;
তার উপরে নেই।’ আমাদের সবাইকে আজকে একথাটি হৃদয়ে ধারণ করার সময় এসেছে। জাতিসংঘ যদি এ
একটি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করত তাহলে বিশ্বময় এতসব যুদ্ধবিগ্রহ হানাহানি থাকত না। সরকার ২০১৫ সালে মা-
বাবার বিষয় মাথায় রেখে যে বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছেন । আমাদের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রতি যে
মানবিকতা দেখিয়েছেন তা তাতে তাকে ভষিত করা হয়েছে Mother of Humanities উপাধিতে । আমার
দৃষ্টিতে সেটার জন্য তিনি এমন একটি খেতাবের দাবির ছিল। এর মাধ্যমে শুধুমা-বাবাকেই সম্মানিত করেনি;
সমাজকে দিয়েছে এক স্বর্গীয় মানবিকতা। একক পরিবারের সদস্যরা ইচছা করলেই আর মা-বাবাকে বাদ দিতে
পারছে না পরিবার থেকে। রাষ্ট্রের এ আইন তাকে বাধ্য করেছে দেখভালের জন্য। বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর সুযোগ
নেই। তবুও থামছে না এর উর্ধ্বগতি। এ থেকেই আমাদের মানবিকতা পরিমাপ করা যায়। যে সন্তানেরা মা-
বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাচ্ছে । রাষ্ট্রের উচিত তাদের আন্দামান দ্বীপপে ঞ্জ পাঠানো। তাহলে সরকারকে প্রত্যেক
নাগরিক স্যালুট করবে অন্তর থেকে। করোনাই একটি শব্দ বেশ শুনা যাচ্ছে। আর তাহলো ইয়া নাফছি, ই্য়া
নাফছি। বৈধ্য অবৈধ্য কোনো সম্পদই কাজে আসছে না। ভোগ বিলাসের কোনো সুযোগ নেই। ঘরে বসেই জীবন
অতিবাহিত করতে হচ্ছে। সময় এসেছে নৈতিক শিক্ষাসমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার। পৃথিবীর ১০ ভাগ
মানুষের হাতে আছে ৯০ ভাগ সম্পদ। আর ৯০ ভাগ মানুষের আছে ১০ ভাগ সম্পদ। এ সমীকরণ থেকে বের
হয়ে আসার সময় এসেছে। বাঁচলে আমরা সবাই বাঁচব একসাথে। সবাই মরলে আপনিও বাদ পড়বেন না।
আমাদের এ চেতনার উদয় ঘটাতে হবে। দিনে দিনে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। আর দেরি নয়; এখনই
না সেটাই আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করল। আমাদের সরকার ডিজিটাল ময় ঘুরে দাড়াবার। সরকারকে ধর্ম বইয়ের নাম পরিবর্তন না করে নৈতিক শিক্ষার আলোকে নির্ধারণ করতে হবে শিক্ষার লক্ষ্য। বাংলা, ইংরেজি, গণিত সমাজবিজ্ঞানসহ জীবনযাপনের প্রতিটি স্তর হবে নৈতিকতায় পণর্ । সরকারকে ত্রাণ বন্টনে Zero Tolerance এর ভি মকা অবতীর্ণ হয়েছে নৈতিক জাতি গঠনেও তেমনি Zero Tolerance দেখতে চায় জাতি। নচিকেতার সুরে বলতে চাই, ‘সে দিনটার স্বপ্ন দেখি ভীষণ রকম।’
লেখক.ড. মোঃ আবদুল কাইয়ুম
সহযোগী অধ্যাপক ও ম্যানেজার আরিবিএম
সেকেন্ড চান্স এডুকেশন প্রোগ্রাম
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, মহাখালী, ঢাকা।

About the Author

-

%d bloggers like this: