বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কিন্ডারগার্টেনের ভূমিকা, করোনা প্রেক্ষিত ও সম্ভাব্য করণীয়

Share This
Tags


মো. সাইফুজ্জামন রানা

সাংবিধানিক ভাবে বাংলাদেশের সরকার দেশের সকল নাগরিকের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ থাকলেও সরকারের একার পক্ষে এই কাজটি করা সম্ভব হচ্ছে না । শুধু তাই নয় সকরকার বাধ্য দেশের সকল নাগরিকের অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে। কিন্তু বাস্তবে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। দেশে এক প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালিত হয় বেশ কয়েক ধরনের বিদ্যালয় তথা স্কুলের মাধ্যমে। সরকারি ব্যবস্থায়; সরকারি ও রেজিষ্ট্রিকৃত প্রাথমকি বিদ্যালয় আছে, রয়েছে এবতেদায়ি মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, প্রাইভেট স্কুল বা কিন্ডারগার্টেন স্কুল, আরো রয়েছে ইংরেজি ভার্সন এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। বিদ্যালয় যেহেতু ভিন্ন; তাই পাঠদানের বিষয় ও কলা-কৌশল এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় রয়েছে ভিন্নতা। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অবশ্য পরিচালিত হয় বৃটিশ শিক্ষাক্রম অনুসারে। সেই সংখ্যা খুব বেশি না দেশে। অন্যদিকে একমুখী প্রাথমিক শিক্ষার কথা কিছু বছর থেকে সরকারি ও বেসরকারি নানা জায়গা থেকে শোনা গেলেও এর বাস্তবায়নে নেই কোনো উদ্যোগ। যদিও ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে একমুখী প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা ঔ দলিল পর্যন্তই আটকে আছে।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এই বাস্তবতায় আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ব্যক্তিমালিকানাধীন স্কুল। আর এগুলোই মূলত কিন্ডারগার্টেন স্কুল নামে বেশি পরিচিত। কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন বা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোর শিক্ষার পরিবেশ ও মান সরকারি স্কুলগুলোর তুলনায় ভালো এবং সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো। সারাদেশে এই ধরনের প্রাইভেট স্কুলের সংখ্যা হাতে গোনা। এ সব বিদ্যালয় পরিচালিত হয় শিক্ষার্থীদের বেতন ও ভর্তুকির অর্থ দ্বারা। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন নামধারী যে হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে দেশব্যাপী তার সংখ্যা নেহায়েত কম না। সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও নেই তবে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের তথ্য মতে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ লক্ষ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছেন। এই তথ্য শুধু ঐক্য পরিষদভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনায় উল্লেখ করা হলো কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরো বেশি হবে। কেননা এলাকা ভিত্তিক এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো সংঘ বা সংগঠনভুক্ত হয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। যেমন ঝিনাইদহ জেলায় রয়েছে জেলা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে শুধু ঝিসাইদহ জেলায় ১০০ টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে মোট ১৫০০ শিক্ষক কাজ করেন। এরা বেশিরভাগ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। আর এ সব বিদ্যালয়ে মোট ২০,০০০ (বিশ হাজার) শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে। দেশের বেশিরভাগ কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ পরিচালনা করে থাকে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন আর তা হলো অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল সরকারি শিক্ষাক্রম ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্ত বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত পাঠ্য পুস্তক ও পাঠ্যসূচি অনুযায়ি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রত্যেক স্কুল বা এলাকা ভিত্তিক কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক নিজস্ব কিছু বই সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করে পাঠ পরিচালনা করে থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি জেলা ভিত্তিক সকল সংগঠন মিলে দেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সংখ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থেকে কোনো অংশে কম হবে না। বরং বেশি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃত কেজি স্কুলের সংখ্যা একত্রিত না থকালেও এটা সহজেই পাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক উপজেলা থেকে প্রতি বছর এই সকল বিদ্যালয় তাদের স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহ করে থাকে। তাই প্রতিটি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সংশ্লিষ্ট উপজেলার সরকারি ও কেজি স্কুলের একটি তালিকা নিশ্চয় রয়েছে।
সারা দেশে কেজি স্কুলের সংখ্যা যাইহোক না কেন, এই সব স্কুল যে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে একথা অস্বীকার করার সামর্থ কারোর নেই। শিক্ষার পরিবেশ, মান নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকতেই পারে কিন্তু প্রতি বছর যে প্রায় ত্রিশ লক্ষ শিশু প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকে তার বিরাট একটি অংশ আসে এই সব কেজি স্কুল থেকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, দেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে এই সব স্কুল বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। এই সব কেজি স্কুলগুলো পরিচালিত হয় মূলত এক বা একাধিক ব্যক্তির উদ্যোগে। এর প্রধান এবং একমাত্র অর্থের উৎস হলো শিক্ষার্থীদের দেওয়া মাসিক বেতন। বেশিরভাগ স্কুল পরিচালিত হয় ভাড়া বাড়িতে। ফলে শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারির বেতন ভাতাদি ও বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য সকল খরচের টাকা আসে শিক্ষার্থীদের বেতেনর টাকা থেকে। গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে করোনা সংক্রমণের শংকায় সরকার দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। সেই থেকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোও বন্ধ রয়েছে। এতে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর শিক্ষা যেমন ব্যাহত হচ্ছে; তেমনি বিপাকে পড়েছেন এই সব বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ। একই সাথে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন এই সব কেজি স্কুলের উদ্যোক্তা বা মালিকগণ। কিছু দিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক সভায় আভাস দিয়েছেন যে, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। যদি তাই হয়, করোনা সংক্রমণের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যাচ্ছে না, তাহলে বহু কেজি স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে অর্থনৈতিক কারণে। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠানের আয় উল্লেখ করার মতো হলেও বেশিরভাগ কেজি স্কুলের আয় যথেষ্ঠ না। এই সকল বিদ্যালয়ের আয় যে যথেষ্ঠ পরিমাণ না তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শিক্ষককের বেতন কাঠামো দেখলে। দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা এই সব কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষকের বেতন কাঠামো ৩ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। যাদের বেতন কাঠামো ১০ হাজার টাকার উপরে সেই সংখ্যা হাতে গোনা অল্প সংখ্যক শিক্ষকের। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এ্যাত অল্প টাকায় কিভাবে শিক্ষকগণ এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি করেন? খুবই যোক্তিক প্রশ্ন এটি। কিন্তু দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ উচ্চ শিক্ষায় সনদধারী বের হয়; কর্ম সংস্থান সেই তুলনায় খুবই কম। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, দেশে বেকারদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট বেশি। এমতাবস্থায় একেবারে বেকার না থেকে কিছু না কিছু করাই ভালো মনে করে অনেকেই খুব অল্প টাকা বেতন হলেও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে শিক্ষতা করে থাকেন। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বিদ্যালয় কেন্দ্রিক পড়াশুনার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে সমাজে। ফলে এসব শিক্ষকগণ স্কুলের বাইরে টিউশনি করে থাকনে। স্কুলের বেতন ও টিউশনির আয় এই দুয়ে মিলে একভাবে জীবন চালিয়ে নিচ্ছিলেন কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। কিন্তু করোনা বাস্তবতায় সব কিছু বন্ধ। না আছে স্কুল, না আছে প্রাইভেট টিউশনির সুযোগ। অন্যদিকে এসব স্কুল যেহেতু ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে উঠেছে। আর বেশিরভাগ স্কুল পরিচালিত হয় ভাড়া বাড়িতে। আর বিদ্যালয়ের আয় বলতে শিক্ষার্থীদের বেতন। গত মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ বেতন পাচ্ছে না। স্কুল বন্ধ থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বেতন আদায় সম্ভব হচ্ছে না কর্তৃপক্ষের। তাছাড়া এটি অমানবিকও বটে । ফলে তাঁরা শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন দিতেও পারছেন না। এমতাবস্থায় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সাথে যুক্ত মালিক, শিক্ষকসহ সকলেই দু:চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। একদিকে আর্থিক সংকট; অন্যদিকে আগামী দিনে এসব স্কুল টিকিয়ে রাখার শংকা তৈরি হয়েছে। করোনা সংকট পরবর্তীতে অনেক শিক্ষার্থী আর স্কুলে ফিরতে পারবে না তাদের পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে এমন ধারণা দিচ্ছেন অনেক গবেষক। কেননা বিশ্ব ব্যাপীই মহা অর্থনৈতিক মন্দা এগিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে দেশে এবং বিদেশে বহুমানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ঘরে খাবারের নিশ্চয়তা না থাকলে মানুষ শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এটাই স্বাভাবিক।
তাহলে এখন করণীয় কী? প্রথমত যত অর্থনৈতিক মন্দায় আসুক না কেন দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত রাখতে হবে। আর সেটা যে শুধু সরকারি বা সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত স্কুল দিয়ে সম্ভব হবে না, এটা পরিষ্কার। সরকারি স্কুলের পাশাপাশি বেসরকারি তথা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর দেশের এসব ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলোর জন্যও সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় এসব স্কুল সরকারি প্রণোদনা ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না। রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রয়োজনে দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যদি তা না করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পুরন করা সম্ভব হবে না। দেশে নিরক্ষর লোকের সংখ্যা বেড়ে যাবে। অন্যদিকে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। সমাজের শৃংখলা ও শান্তি বিনষ্ট হবে। এ সব দিক বিবেচনা করে দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভেবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর জন্যও সরকারি বিশেষ সহায়তা প্রদান জরুরি।

লেখক পরিচিতি: মো. সাইফুজ্জামান রানা, শিক্ষা বিষয়ক উন্নয়ন কর্মী, ইমেইল: [email protected]

About the Author

-

%d bloggers like this: