নবীজি রুজি দে দো

Share This
Tags

বিপ্রদাশ বড়ুয়া


নবীজি রুজি দে দো

দোয়েল বাংলার শ্রেষ্ঠ গায়ক পাখি। খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে তার নির্বাচিত গাছের নির্ধারিত ডালে বসে শুরু করবে সুরের ঝরনাধারা। আলাপ। তান। আমার তিনতলার জানালার নিচে ওর নির্ধারিত প্রিয় ডুমুরগাছটি। ওখানে বসেই ওর ভোর শুরু করবে। আমিও ওর নেওটা। কবি জসীমউদ্দীন তো তা লিখেইছেন, ‘কণ্ঠে বাজে ললিত ভৈরবী কুহরে যেমন পাখী।’ ভোরের দোয়েলের গান শুনে না হয় নভেল করোনাভাইরাসের রুদ্ররোষে পড়ব! তাতে আমি রাজি আছি। এ জন্য মরণসাগর পাড়ি দেওয়ার আগে স্বপ্ন সঞ্চয় করতে হবে না? জ্ঞানী-গুণীরা বলে গেছেন সাবধান ও সতর্ক থাকতে।

পাখিদের প্রাতঃস্মরণীয় সালিম আলীর বইয়ে বোধ করি পেয়েছি, দোয়েল খুব ভোরে উঠে তার নির্বাচিত গাছের সবচেয়ে যোগ্য ডালে বসে নহবৎ বাজানোর মতো ভোরের গান গায়। কী গায়? হিন্দুস্তানি মুসলমানরা বলেন, ‘নবীজি রুজি দে দো।’ আর খ্রিস্টান জগৎ বলেন, দোয়েলের বুলিটি হলো, ‘গিভ আস দিস ডে আওয়ার ডেইলি ব্রেড।’ এই ডেইলি ব্রেডের জন্য দুনিয়ার গরিব-গুর্বো দিশাহারা, ছন্নছাড়া।

কী আশ্চর্য! দুই প্রার্থনার মৌলিক অর্থ তো একই। আজ আমরা অসহায়-প্রায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে গরিবদের মতো বুলবুলির কথায় বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছি। গরিবদের রুজি-রোজগার বন্ধ হওয়ার অর্থ ‘লাল হুমকি’। সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া নয় কি! আমাদের দোয়েল কিন্তু বুঝে নিয়েছে বহুকাল আগেই। তার গান শুনে সেই থেকে মানুষ তা মনে রেখে দিয়েছে—দোয়েলের প্রথম ভোরের ওই রেওয়াজ শুনে। এ জন্যই কি দোয়েল বাংলার শ্রেষ্ঠ গায়ক পাখি! এ জন্য তার আদুরে নাম আমি বলি ‘দোয়েল-সোনা’! আর সত্যিই তো ভোরের দোয়েল পাখি তো সাদামাটা ডাক দেয় না, তান সৃষ্টি করে। সব পাখি বা সব মানুষ তো তান সৃষ্টি করতে পারে না। যেমন—‘সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’ বাণীর মতো। ঈগল বা চিলের মতো সব পাখি আকাশের অনেক ওপরে উঠে প্রসন্ন আয়েশ করতে পারে না, জানেও না। বাংলার দোয়েল কি এই সত্য বহু আগে থেকেই জেনে আছে! তাই তার ভোরের এই গান মানুষ মনে রেখে দিয়েছে এবং প্রথম ভোরে দোয়েলের সঙ্গে গান রেওয়াজ করে। এ জন্যই কি দোয়েল বাংলার জাতীয় পাখির গৌরব পেয়েছে! এ জন্যই কি তার নাম দোয়েল-সোনা নয়! এ জন্যই কি দোয়েল নিতান্তই সাদামাটা অর্থাৎ সাদা-কালো সহজিয়া!

কভিড ভাইরাস রোগ নিম্নবিত্তদেরই সবচেয়ে হাহাকারে চেপে ধরেছে। এমনকি সাধারণ গরিবদের দৈহিক সামর্থ্যের ব্যবহার করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে দিয়েছে! সেই সুযোগে অর্থবানরা পেয়ে যাচ্ছে প্রায় রেহাই। সব ক্ষেত্রে গরিব-গুর্বোদেরই লাঞ্ছনা—‘কেষ্টা বেটাই চোর’ যেমন। আকাশের চাঁদও অমাবস্যায় ডুব দিয়ে তারপর দিনে দিনে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। তত দিনে গরিব-গুর্বোরা চিঁড়ে-চ্যাপ্টা। ওদিকে দোয়েল আশার বাণী নিয়ে প্রথম ভোর থেকে রেওয়াজ করে যাচ্ছে সুমধুর সুরের তান তুলে—‘নবীজি রুজি দে দো’, ‘গিভ আস দিস ডে আওয়ার ডেইলি ব্রেড’।

দোয়েল শুধু তার এলাকা রক্ষার ঘোষণা বা গলা সাধনা নয়, প্রেম-প্রীতির চর্চাও করে। প্রেমিকা বা গিন্নি বা স্থায়ী প্রেমিকার প্রতি বিশ্বাস জমা রাখে। ও দোয়েল, তুমি সুধা দাও, আস্থা দাও, সবার জন্য ‘রুজি দে দো’ বলে কল্যাণ প্রার্থনায় অটল থেকো। ‘কভিড ভাইরাস, তুমি তফাত যাও’ মঙ্গল বার্তাটি গেয়ে যাও। তোমার আর সব কথা না-বলাই থেকে গেল। মানুষ বড় নিষ্ঠুর, প্রকৃতির ঋণটুকুই সহজে স্বীকার করে না। সৌজন্যে-দৈনিক কালের কন্ঠ |

About the Author

-

%d bloggers like this: