কবরের ফেরিওয়ালা

Share This
Tags


মোঃ আহছান উল্লাহ-ঃ
বরিশালের গৌরনদী উপজেলা সদরের উত্তর বিজয়পুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ সামচুল হক সরদার। এলাকায় তিনি কবরের ফেরিওয়ালা সামচু নানা বলে পরিচিত। গৌরনদী উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় তাকে এ নামেই চেনেন সবাই । এ নামের তকমাটা তিনি সিলেট থেকে প্রথম পেয়েছেন। আর এর কারন হল তিনি মৃত ব্যক্তির কবর করে দেন বিনা পারিশ্রমিকে । মানুষ মারা যাওয়ার খবর পেলেই ছুটে যান কবর তৈরি করতে। তার জীবনে ১৫ হাজারেরও বেশী কবর তৈরী করেছেন।
১৯৩৭ সালের ২৯ নবেম্ভার জন্ম নেয়া এই বর্ষিয়ান ব্যক্তি বয়সের ভারে অনেকটা নুজ্জ হয়ে গেলেও থেমে যান নি তিনি। ৬৫ বছরের কবর রচনার রয়েছে অনেক মর্মোন্দত কাহিনী। যে ভাবে তিনি কবর তৈরি করার এই মহান সেবায় জড়িত হন। বাল্যকালে তার বাবা মরহুম ছবেদ আলী সরদারের হাত ধরেই কবর তৈরীর কাজ শুরু করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যান্ত ধর্মভীরু, জীবন জীবনজীবিকার তাগিদে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছেন। এর মধ্যে সিলেটের মৌলভী বাজারের শাহবাজপুর এলাকায় বেশী সময় কাটিয়েছেন। ১৯৮৬ সালে গ্রামের বাড়ি গৌরনদীতে আসেন এলাকায় এসেও তিনি কবর তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কবর খননের দীর্ঘ জীবনে কোন স্বরনীয় ঘটনা আছে কিনা জানতে চাইলে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে কিছু সময়ের জন্য তিনি বরফের মত জমে জান। এরপর বলতে শুরু করেন কবর রচনার অনেক মর্মোন্দত কাহিনী। অনেক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা বললেও অনেকের পরিচয় গোপন রেখেছেন তিনি। বলেছেন আমি জাগতিক কিছু পাওয়ার জন্য কবর খনন করিনি। আর কারো নাম প্রকাশ করলে সেটা গীবত হবে আর এ পাপের ভাগী আমি হতে চাই না। তবে সৃষ্টির সেরা মানুষ আর এ মানুষের জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু জীবনের এই তিনটি গুরুত্ববহ ঘটনার দুইটিতে দাম্পত্য জীবনের পরিধি।
তিনি বলেন অনেক কবর করেছি খুব আনন্দ হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে কবরের কাজ শেষ হয়ে যেত। আবার অনেক মানুষের কবর করতে অনেক সময় ক্ষেপন হত কবরের কাজ যেন শেষ হত না একদিক শেষ করলে অপরদিক মনে হত আবার মিলিয়া গেছে। আসলে এ গুলো মানুষের জাগতিক জীবনের কর্মের ভালোমন্দ ফলাফল। অনেক মানুষের কবর ২/৩ বারও খনন করা লাগছে একবার খনন করার কাজ শেষ না করতেই ভেংগে পরে যেত। আবার অনেকের কবর খনন করা হয়েছে এমন সময় একজন বাধা দিল এখানে তার কবর হবে না পুনরায় আবার কবর খনন করা লাগত এটি আসলে অনেকটা পারিবারিক দন্ধে হত। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাতুর একটা বিষয় আমাকে এখনও পিরা দেয়। আমি তখন সিলেটে আমার প্রতিবেশী ছিল কাছেম মিয়া অভাবের তারনায় আমার মত সিলেটে পারি জমিয়ে ছিল রুটি রুজির জন্য,দাম্পত্য জীবনে কাছেম ভাই ছিলেন নিঃসন্তান। স্বামী স্ত্রী দুজনই আমার পাশের খুপরি ঘড়ে বাস করত। আমার সাথে যখন পরিচয় হয় তখন তাদের প্রায় ৩০ বছরের দাম্পত্য জীবন বয়সে কাসেম ভাই আমার অনেক বড় ছিলেন। যতদুর মনে পরে ভোলার সন্দীপ থেকে তারা নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে সিলেটে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ঠেলা গাড়ি চালিয়ে যা আয় হত তা দিয়েই কোন মতে বেঁেচ ছিলেন কাছেম ভাই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হঠাৎ একদিন কাছেম ভাইর স্ত্রী মারা গেলেন কিংকর্তব্যবিমুর হয়ে পড়লেন। সকালে যখন কাজের জন্য বের হবেন দুমুঠো অন্যর জোগাড়ে ঠিক তখন স্ত্রীর লাশ নিয়ে অমানিষার ঘোড় অন্ধকারে পতিত হলেন কাছেম ভাই। সময়টাও খারাপ সময় ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে গিয়েছিল সাড়া দেশে। যে যার মত করে চলছেন মৃত দেহটাকে গোসল দেয়ার মত লোক পাওয়া যাচ্ছিল না, কোথায় সমাহিত করা হবে তাও নির্ধারন করা যাচ্ছিল না। যদিও পাশে এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানের জায়গা ছিল তাদের কাছে কবরের স্থানের জন্য আবেদন করা হলে তারা নাকচ করে দেন। আসলে আমিও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পাড়ছিলাম না কি করব। কাছেম ভাই হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন সামচু পাহারের টিলায় তোমার ভাবীর জন্য কবর কর আমার প্রান পাখিরে আমি নিজেই নিয়ে আসতেছি।কাছেম ভাই তার ঠেলা গাড়ীতে করে জীবন সঙ্গিনীর মৃত দেহ নিয়ে কবর দেয়ার জন্য পাহারের টিলার দিকে আসছেন। আসলে নিজের স্ত্রীকে কবর দেয়ার জন্য নিজের ঠেলা গাড়ীতে করে তার মৃতদেহ বহন করে যাচ্ছেন সে কি দৃশ্য আমি বুঝাইতে পাড়বোনা।
প্রিয় পাঠক কবরের ফেরিওয়ালা সামচু নানার কবর খননের দীর্ঘ অবিজ্ঞতার কিছু স্বৃতিচারনের অংশবিশেষ কাব্যিক আকারে তুলে ধরা হল। ৩৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানিয়া কাছেম মিয়ার স্ত্রী না ফেরার দেশে চলে গেলেন। ৩৫ বছরের জীবনে তাদের কোন সন্তান ছিল না। তারা বস্তীবাসী হলেও তাদের দাম্পত্য জীবনে কোন ছেদ ছিল না। তারা ছিল সুখী দম্পত্তি। জীবন সঙ্গিনীকে অন্তিম বিদায় জানাইবার এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য শহর নামক কংক্রিটের জংগলের।
জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু জীবনের এই তিনটি গুরুত্ববহ ঘটনার দুইটিতে দাম্পত্য জীবনের পরিধি। পতি বা পতিœর মৃত্যুতে নিসঙ্গবোধে মানুষ নিথর হইয়া ওঠে। আপন স্ত্রীর লাশ ঠেলাগাড়িতে তুলিয়া অতিসাধারণ সেই মানুষটি গোরস্তানের পথে যাইবার সময়টিতে কেবল নিজে ভাবেন নাই। হয়ত পথচারী পথিকদেরও ভাবান্তর ঘটাইয়াছেন।
যৌবন, কর্ম জীবন ও জীবন সংগ্রামের শুরুতে যাহাকে সুখ-দুঃখের সাথী হিসাবে পেয়েছিলেন- অশেষ দুঃখ ও অপরিমেয় আনন্দ কেবল যাহার সহিত ভাগ করিয়া লওয়া যাইত, তিনি নিথর লাশ হইয়া এ মায়াময় পৃথিবী ছাড়িয়া গেছেন না ফেরার দেশে। নিজ হাতে তাকে গোরস্তানে শেষ শয়নে রাখিয়া আসার সেই যাত্রায় তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ। যেন জীবন সঙ্গিনীর শয্যাপৃষ্ঠে এখনও তিনি বসিয়া আছেন। নিজ স্ত্রীর লাশ বহনকারী ঠেলাগাড়ীর গতির সাথে হয়ত অপলক স্থির দৃষ্টির সামনে সুরম্য এই কংক্রিটের জংগলের দৃশ্যগুলি ভারাক্রান্ত মনে অতিক্রান্ত হইছে। স্মৃতিপটে তাহার দাম্পত্য জীবনের ঘটনাপ্রবাহ আবার বহমান চিত্রধারার মত হয়ত ভাসিয়া উঠিয়াছিল । নিথর শোক বহন করতে গিয়া পা যেন ভারী হইয়া ওঠিয়াছিল। এমনি করিয়া কংক্রিটের জংগল নামক শহরে অনেক মানুষ প্রতিদিন আপনজনকে চিরনিদ্রায় রাখিয়া গোটা পরিবার শোকে কাঁদে, শোকে স্তব্ধ হয়। প্রতিদিন অনবরত। নব জন্মকে স্থান করিয়া দিয়া জীবনের বিভিন্ন স্তর থেকে এ কংক্রিটের জঙ্গল থেকে মানুষ বিদায় নেয়। গোরস্থানের স্থায়ী অংশে ফলকে ফলকে উহার কিছু অভিব্যক্তি লিখিত থাকে। কিন্তু কাছেম মিয়ার মতো সামর্থ সীমিত অস্থায়ী কবরে যারা আপনজনকে রেখে আসে প্রিয়জনদের জন্য তাদের প্রেম-প্রীতি ভালবাসা যে কম নয়, ওই সময়টিতে কাছেম মিয়ার প্রগাঢ় মুখচ্ছবি না দেখলে হয়ত অনুমান করা যাবে না। এ নগরী নামক কংক্রিটের জঙ্গলে জন্ম, জীবন উপখ্যান আর মৃতই নয়। কংক্রিটের জঙ্গল হলেও এই দেশ, এই নগরী,এই শহর, এই উপশহর এমনি প্রগাঢ় ভালবাসার বন্ধনে বাঁধা। ছোট বড় সকল মানুষের জীবন স্মৃতিরও নাট্যশালা। নগরীর ব্যস্ত জীবন অতি অতি জরুরী প্রত্যাহিক কর্মবন্ধন সবাইকে এমনি করিয়া আকরাইয়া রাখে, পড়শী মরলেও যেন তাকাইবার ফুরসৎ হয় না। অথচ ভিআইপিদের চলার জন্য শত ব্যস্ততম রাস্তার সব যান থেমে যায়? অথচ কাছেম মিয়ার মত সমজনদের মৃত্যুর পর জানাজায় বা সৎকারে শরীক হওয়ার জন্য গ্রামের সব কাজ ফেলিয়া আসিয়া জড়ো হয় না শহরের মানুষ। নগরীতে তাই সাধারণ মৃত্যু শবযাত্রা বা নিঃসঙ্গ যাত্রাই কেবল দেখে। অসাধারণ মৃত্যু কীর্তি অনুযায়ী জড়ো করে মানুষ, পরিবেশ পরিস্থিতি, প্রকৃতি তাহাতে জোগায় উপাচার।
নবজন্মকে বরণের প্রস্তুতি ওয়ার্ডে ও হাসপাতলে যেমন সমস্যা, কাছেম মিয়ার মতো মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার কর্তব্য সকল নগরালয়ের, জীবন লালন জীবন-পালন, জীবন সংগ্রামের কর্মক্ষেত্রে যেমন সমস্যা কেবল কাছেম মিয়ার মত নিঃসম্বলের শেষ কৃত নয়। ধনবান প্রভাবশালীদের অন্তিম শয়নে আছে। এলোমেলো অগোছালো কংক্রিটের জঙ্গলে কবরের স্থান ও সংকুচিত হয়ে আসছে। আজকে যারা পা ঝাকরিয়ে অহঙ্কারের চূড়ায় আরোহন করে প্রভাব প্রতিপত্তি বিলাস-বহুল গাড়ী হাজার হাজার অস্ত্রধারী নিখুঁত বডিগার্ড নিয়ে পান্ডিত্ত বিলাসীতায় মেতে উঠেন। তাদের জন্য কবরের ফেরিওয়ালা সামচু নানা একটি দৃষ্টান্ত। বাড়ির জন্য শিল্পের জন্য যারা সাইন ঝুলিয়ে চলছেন তাহারাও একদিন সীমিত হইয়া আসা গোরস্থানেরও আগাম স্থান বুকিং দিয়ে রাখেন। কেননা সেখানেও সিমিত সাইট অপেক্ষা করছে আপনার লাশের জন্য। সেদিন হয়ত আপনার জন্য সিমিত জাগার ঘরটি নির্মানের জন্য কংক্রিটের জঙ্গলের কবরের ফেরিওয়ালা সামচু নানার মত একজন হাজির হয়ে যাবে।
সর্বপরি মানুষের জীবনে চলার পথে তার গন্তব্যগুলো নবায়িত হতে থাকে, জীবনের স্তরগুলো পরিবর্তিত হতে থাকে। সে তার মাতৃগর্ভে একটি স্তর কাটায়, জমিনে একটি স্তর কাটায়, আর একটি স্তর সে কাটায় মাটির অভ্যন্তরে পুনরুখ্যান পর্যন্ত। বাহ্যিকভাবে জীবনের এ যাত্রা দীর্ঘ মনে হলেও তা কিন্তু খুব দ্রুত অস্তগামী। পৃথিবী চিরস্থায়ী বাসস্থান নয়। পৃথিবীতে বুদ্ধিমান ব্যক্তি বিভিন্ন অবস্থার আবর্তন ও জীবনের আয়ুগুলোর শেষ হয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে। ফলে তার হৃদয় কোমল হয়, তার অন্তর বিগলিত হয়। কবরই হচ্ছে সেই গন্তব্য, যাতে প্রত্যেক যাত্রীকেই পরিশেষে অবতরণ করতে হবে। এ কবরই উপদেশদাতা হিসেবে যথেষ্ট।

About the Author

-

%d bloggers like this: