কাশ্মীরের গিলগিট-বাল্টিস্তানে বাস করে রহস্যময় হুনজা উপজাতি, বাঁচেন কমপক্ষে ১২০ বছর

Share This
Tags

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পাকিস্তানের একেবারে উত্তরে অবস্থিত পাক অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট-বাল্টিস্তান। কারাকোরাম,পশ্চিম হিমালয়,পামির ও হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণী দিয়ে ঘেরা ছবির মত সুন্দর এই প্রদেশের উত্তরে আছে নয়নাভিরাম হুনজা উপত্যকা। উপত্যকাটির একদিকে আফগানিস্তানের ওয়াকান করিডর ও অন্য দিকে চীনের শিনজিয়াং এলাকা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য হুনজা উপত্যকা পৃথিবী বিখ্যাত। অপরুপ নৈসর্গের টানে প্রতিবছর ছুটে আসেন হাজার হাজার দেশি বিদেশি পর্যটক ও পর্বতাভিযাত্রী।

 

 

 

 

হুনজা উপত্যকা

পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন  হুনজা উপত্যকাতেই লুকিয়ে আছে এক রহস্য

যা এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। এই উপত্যকাতেই বাস করে হুনজা বা বুরুশো নামে একটি জনগোষ্ঠী। যে গোষ্ঠীর  মানুষজন অমর নন, কিন্তু চিরনবীন। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এটা প্রায় মিথ হয়ে গেছে, হুনজারা নাকি যমের দুয়ারে কাঁটা দিয়ে অনায়াসে জীবনের পিচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে থাকেন।

যেখানে সারা পাকিস্তানের গড় আয়ু ৬৭, সেখানে হুনজাদের গড় আয়ু নাকি ১২০ বছর। হুনজা উপত্যকায় এর চেয়েও বেশী বয়সের মানুষের সংখ্যাও  নেহাত কম নয়। জাপানকে আয়ুর ক্ষেত্রে স্লগ ওভারে  হারিয়ে দিচ্ছেন হুনজারা।

 

২০০০ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী,  হুনজা উপত্যকাতে প্রায় ৮৭০০০  হুনজার বাস। এঁরা ইসলাম ধর্মের শিয়া সম্প্রদায় ভুক্ত নিজামী ইসমাইলি ধারার অনুসারী। কথা বলেন বুরুশাসকি ভাষায়। স্থানীয় লোকগাথা বলে, এঁরা  একসময় হারিয়ে যাওয়া শাংগ্রিলা সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের উত্তরপুরুষ। যদিও তা অনেক গবেষক মেনে নিতে রাজি নন।

হুনজা উপজাতি সংক্রান্ত কিছু বিষ্ময়কর কিংবদন্তি

বর্তমান বিশ্ব শারীরিকভাবে সক্ষম থাকতে, যৌবন ধরে রাখতে, দীর্ঘায়ু হতে যেখানে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে, সেখানে  প্রাকৃতিকভাবেই  হুনজা সম্প্রদায় বার্ধক্যকে  ঠেকিয়ে রেখেছেন। হুনজা সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে ১৬৫ বছর বাঁচার রেকর্ডও রয়েছে।

 

হুনজাদের নাকি দেখতে বয়েসের তুলনায় অনেক তরুণ লাগে। তাঁরা  খুব কমই অসুস্থ হন। একজন ৯০ বছরের বৃদ্ধও বাবা হওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ৬০ থেকে ৭০ বছরের হুনজা মহিলাও  অনায়াসে গর্ভবতী হন ও সুস্থ সন্তান প্রসব করেন। দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ  হুনজাদের ডিকশনারিতেই নেই। হুনজারা  কোনও কিছু নিয়ে সামান্যতম চিন্তাও করেন না।

ক্যানসার নামটাই  শোনেননি হুনজারা। সব বয়সের  হুনজা নারী পুরুষ  উদয় থেকে অস্ত পরিশ্রম করেন। একজন ৭০ বছরের হুনজা বৃদ্ধের কাছে পাহাড়ি পথে দৈনিক ১০ থেকে ১৫ কিমি হাঁটা  জলভাত। ১০০ বছরেও শক্ত সমর্থ থাকেন হুনজা পুরুষ ও নারীরা। ৪০ কেজি ওজনের শস্য বোঝাই বস্তা অনায়াসে ক্ষেত থেকে  নিয়ে ফেরেন।

 

 

 

হুনজারা খান কম কিন্তু পরিশ্রম করেন বেশি

হুনজা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য নিয়ে প্রায় একশ বছর ধরে চর্চা চললেও, তা বিশ্বের কাছে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে ১৯৮৪ সালে। ইংল্যান্ডের হিথরো বিমানবন্দরে পাকিস্তান থেকে আসেন সৈয়দ আব্দুল মবুদু নামে এক বৃদ্ধ হুনজা।  পাসপোর্টে তাঁর জন্ম তারিখ দেখে চমকে যান ইমিগ্রেশন অফিসাররা। পাসপোর্টে সৈয়দ আব্দুল মবুদু্র জন্ম সাল দেওয়া ছিল ১৮৩২। মানে তাঁর বয়স তখন ছিল ১৫২ বছর। ইমিগ্রেশন অফিসাররা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে মানুষ এতদিন বাঁচতে পারে। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সাড়া পড়ে যায় বিশ্বে। গবেষকরা দলে দলে আসতে শুরু করেন হুনজা উপত্যকায়।

হুনজাদের জীবনযাত্রার মধ্যেই কি লুকিয়ে আছে রহস্য!

হুনজারা দিনে মাত্র দু’বার খাবার খান। সূর্য ওঠার পরে একটা ভারি ব্রেকফাস্ট ও সূর্যাস্তের পরেই হালকা ডিনার করে নেন। এর মাঝে হুনজারা আর কোনও খাবার খান না। তবে সম্পুর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খান এবং প্রত্যেকটি হুনজা পরিবার নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্যশষ্য ও সবজি নিজেরা উৎপাদন করে নেন।

 

 

 

 

 

ম্পুর্ণ  প্রাকৃতিক খাবার খান হুনজারা

হুনজারা তাঁদের খাদ্যতালিকায় রাখেন প্রচুর পরিমাণে শুকনো অ্যাপ্রিকট (খোবানি), লেবু জাতীয় ফল, বাদাম, শিম, ভুট্টা, বার্লি ও বাজরার মতো শস্য। মাখন, পনির, ডিম ও দুধ তুলনায় কম খান হুনজারা। মাংস প্রায় খানই না। খেলেও বছরে এক দুবার ভেড়া বা মুরগির মাংস খান। অন্য কোনও মাংস খান না। এছাড়াও, তুমুরু নামে, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টে ভরপুর এক প্রকার উদ্ভিদের পাতা ফুটিয়ে চায়ের মতো পান করেন হুনজারা।

প্রাচীন রীতি মেনে, হুনজারা বছরে চার মাস শুকনো অ্যাপ্রিকট ফলের গুঁড়োর শরবত ছাড়া আর কিছু খান না। দুর্গম স্থানে বাস করার কারণে এবং বিভিন্ন কাজে প্রতিদিনই হুনজাদের প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। এ ছাড়া হুনজারা সব কথাতেই  হাসেন। হাসি ঠাট্টা তামাসা তাঁদের জীবনের অন্যতম অঙ্গ। গোমড়ামুখের হুনজাকে দেখতে পাওয়া  বিরল ব্যাপার।

 

নানা গবেষকের নানা মত

অনেক গবেষক মনে করেন, হুনজাদের দীর্ঘায়ু ও বেশী বয়সেও কর্মক্ষম থাকার পিছনে অ্যাপ্রিকট ফলটির ভূমিকা আছে।কারণ অ্যাপ্রিকট ফলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যামিগডালিন (ভিটামিন বি-১৭) আছে, যা ক্যানসার ও অনান্য রোগ প্রতিরোধে সক্ষম। হুনজারা বছরে চার মাস সারাদিন শুধু অ্যাপ্রিকটের শরবত খান বলে, তাঁদের শরীরে কোনও রোগ বাসা বাঁধে না। এই গবেষকদের মতে, হুনজারাই সম্ভবত বিশ্বে একমাত্র ‘ক্যানসার-টিউমার ফ্রি’ সম্প্রদায়।

 

আরেক দল গবেষক মনে করেন, হুনজাদের দীর্ঘ জীবন আর নিরোগ থাকার পিছনে আছে দূষণমুক্ত বাতাস, হিমবাহ থেকে আসা প্রাকৃতিক মিনারেল ওয়াটার, সারাবছর হিমশীতল জলে স্নানের অভ্যাস। শীতকালে হুনজা উপত্যকা বরফে ঢেকে যায়, তখনও হুনজারা গরম জলে স্নান করেন না। এবং হুনজারা খান কম, কিন্তু পরিশ্রম করেন বেশি।

কিছু গবেষক বলছেন হুনজারা নিরুত্তাপ ও উদ্বেগহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাই তাঁরা মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত অসুখবিসুখে ভোগেন না। তাঁরা শিশুদের মতোই জীবন যাপন করেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেন। এটাই তাঁদের দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য।

 

 

অসামান্য রুপবতী হন হুনজা নারীরা

আছে ভিন্নমতও

হুনজারা বহুদিন বাঁচেন, এই বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই গবেষকদের মধ্যে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন হুনজাদের দীর্ঘায়ু হওয়ার বিষয়টি অতিরঞ্জিত। তাঁরা বলছেন হুনজারা নিজেরাই নিজেদের বয়স বলেন। বয়সের কোনও নথি নেই। বয়স বাড়িয়ে বলেন। হুনজারা কোনও ক্যালেন্ডার ব্যবহার করেন না। তাই হুনজাদের বয়সের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কোথায় ?

ডাক্তার জন ক্লার্ক নামে এক চিকিৎসক ১৯৫৬ সালে কুড়ি মাস ছিলেন হুনজা উপত্যকায়। দেশে ফিরে Hunza – Lost Kingdom of the Himalayas নামে একটা বই লিখে ছিলেন। সেই বইতে তিনি লিখেছিলেন হুনজাদেরও রোগ হয়। তিনি ওই ২০ মাসে সব বয়সের ৫৬৮৪ জন হুনজাকে চিকিৎসা করেন।

 

তিনি লিখেছিলেন, তাঁর কাছে আসা বেশির ভাগ হুনজা রোগীই ম্যালেরিয়া, কৃমি, চোখের রোগে ভুগতেন। অস্বাভাবিক দ্রুততায় রোগ সেরেও যেত। জন ক্লার্ক, হুনজাদের দীর্ঘায়ু নিয়ে রীতিমত সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে হুনজারা পাকিস্তানের অনান্য মানুষদের থেকে গড়ে বেশি দিন বাঁচেন, এ ব্যাপারে তিনি নিঃসন্দেহ।

গবেষকরা হুনজাদের দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্যকে আতস কাচের তলায় ফেলে চাপানউতরের খেলায় মাতলেও, তাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই হুনজাদের। কারণ, তাঁরা প্রকৃতির বরপুত্র। তাই প্রকৃতির কোলে, জীবনের পিচে, হাসতে হাসতে রান নিয়ে সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে যান হুনজারা। অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকে বিশ্ব। সৌজন্যে ওয়াল

 

About the Author

-

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

%d bloggers like this: