নিষ্ঠুরতা শেষ হবে কবে ! 

Share This
Tags

 

রূপাঞ্জন গোস্বামী//সবুজবাংলা ডেস্ক ঃ

মানুষ কখনও কখনও ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের জন্মগত দেহে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই সারা পৃথিবীর বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের দেহে কৃত্রিম ভাবে কিছু পরিবর্তন এনে অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা হতে চেয়েছে।কখনও শৈল্পিক ভাবনা থেকে, কখনও ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে, কখনও সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে, কখনও সৌন্দর্য ও যৌন আবেদন বৃদ্ধির জন্য।

কখনও কখনও আবার সমাজ বাধ্য করেছে ঈশ্বরের দেওয়া দেহে পরিবর্তন আনতে। যেমন বাধ্য করেছে মায়ানমারের ‘শান’ প্রদেশের কায়ান উপজাতির নারীদের। যাঁদেরকে বিশ্ব নাম দিয়েছে ‘জিরাফ নারী। জিরাফ নারীদের হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে তাঁদের মাথাটা হয়তো শরীর থেকে আলাদা। মাথাটি কতগুলো রিংয়ের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

শান প্রদেশের কায়ান উপজাতি

উত্তরদিকে চিন, পূর্ব দিকে লাওস, দক্ষিণ দিকে থাইল্যান্ড দিয়ে ঘেরা মায়ানমারের শান প্রদেশ। এই প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করেন কায়ান উপজাতি। মায়ানমারে তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এর মধ্যে শান প্রদেশেই আছেন ৪০ হাজার কায়ান। প্রাচীন কাল থেকেই কায়ানদের লড়াকু মনোভাব ও নিষ্ঠুরতার কথা বিভিন্ন পরিব্রাজক লিখে গেছেন। কায়ানরা নিজেদের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁদের বৃত্তে বাইরের লোকের প্রবেশ পছন্দ করেন না। নিজস্ব ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন।

মায়ানমারের এই কায়ানদের এক উপগোষ্ঠি মায়ানমারের জুন্টা বাহিনীর অত্যাচারে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে পালিয়ে আসে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে। এই কায়ান লাহুই’রা স্থানীয়ভাবে পাদাউং নামেও পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় পাদাউং শব্দটির অর্থ লম্বা গলা। কায়ান লাহুই’রা বসতি গড়ে তোলে থাই উত্তর সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল মায় হং সন, মুয়াং ও চিয়াং দাওতে। অধিকাংশ কায়ানদের মতে তাঁরা মায়ানমারের চেয়ে থাইল্যান্ডে অনেক সুখেই আছেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই! সে প্রসঙ্গ পরে।

কায়ানরা মেয়েদের পাঁচ বছর বয়স হলেই গলায় পরিয়ে দেন ১ কেজি ওজনের ধাতুর তৈরী বলয়-এর মত ভারী হার। ৮ বছর বয়সে ১ কেজি থেকে বাড়িয়ে ২ কেজি, এবং ১২ বছর বয়সে ২ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৩ কেজির রিং পরানো হয়। বলয়-এর সংখ্যা বাড়তেই থাকে বালিকার কচি গলাটাকে ঘিরে।

শিশুকন্যাগুলির গলার ধাতব বলয়গুলি দেখলে মনে হবে, একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলি  কোনও পৃথক পৃথক রিং বা বলয় না। বরং একই সাথে জোড়া লাগানো পেঁচানো কুণ্ডলী। পিতলের সঙ্গে সামান্য সোনা মিশিয়ে তৈরি করা হয় বলয়গুলি। কুণ্ডলীর এক পাকের ওজন বয়েস ভেদে গিয়ে দাঁড়ায় ২৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম।

 

 

শৈশবেই গলায় পরানো হয় পরাধীনতার বেড়ি

যদি দেখা যায় যে কায়ান বালিকা আরও বেশি ভার সহ্য করতে পারবে, তাহলে ১৫ বছর বয়সে আরও ২ কেজি ওজনের বলয় যোগ করা হয়। বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক কায়ান নারী ৫ কেজি ওজনের ধাতব কুণ্ডলী গলায় পরে থাকতে বাধ্য হন। তবে কোনও কোনও কায়ান নারীকে ১০ কেজি ওজনের রিংও পরে থাকতে দেখা যায়। কেন না যে যত বেশি ওজনের বলয় গলায় পরবেন, কায়ান সমাজ তাঁকে তত মর্যাদা সম্পন্ন নারী বলে গণ্য করবে। ফলে যন্ত্রণার বিনিময়ে সম্মান কিনতে রাজি হয়ে যান অনেক কায়ান নারী।

যখন কায়ান নারী যুবতী হন কাঁধের ওপর থেকে চিবুকের নীচ পর্যন্ত গলার চারপাশে পেঁচিয়ে ধরে ২০ থেকে ২৫টি বলয়।  জিরাফের মতো অস্বাভাবিক লম্বা লাগে কায়ান নারীদের গলা। বলয় পরা অবস্থায় কায়ান নারীদের গলা ১ ফুট বা তার চেয়েও বেশি লম্বা মনে হয়। শুনতে অবাক লাগবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা গলার দৈর্ঘ্য ১৫.৭৫ ইঞ্চি এবং গলাটি একজন কায়ান নারীর। শুধু তাঁদের গলাতেই নয়, কায়ান নারীদের দুই হাত পায়েও আমৃত্যু জড়িয়ে থাকে এই ধাতব বেড়ি। যাকে ভদ্রভাষায় অলংকার বলতে পারেন।

গলা কেন লম্বা মনে হয়

বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই ভারী ধাতব রিং কায়ান মহিলাদের গলা লম্বা না করে তাঁদের দুই কাঁধের হাড়কে দু’দিকে অস্বাভাবিক ঢালু করে দেয়। যার ফলে তাঁদের গলা লম্বা বলে মনে হয়। আমাদের মতই তাঁদেরও গলার হাড়ের সংখ্যা ৭টি।  বাল্যকাল থেকে ভারী রিং পরার জন্য কায়ান নারীদের গলার চামড়া বিবর্ণ হয়ে যায়। গলা ও ঘাড়ের পেশীগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে। স্পাইনাল কর্ড রীতিমত ক্ষতিগ্রস্থ হয়।  এত ভার নিয়ে হাঁটতে খুবই অসুবিধা হয় তাঁদের। রাতে ঠিক মত শুতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে কম ঘুমানোর ফলে বেশিরভাগ কায়ান নারীই স্বল্পায়ু হন।

কেন পরানো হয়েছিল এই বেড়ি

কায়ান নারীদের গলায় কিভাবে বেড়ি পরানো শুরু হয়েছিল তা এখনও সঠিকভাবে জানা যায়নি। তাই  বিভিন্ন মতবাদ আছে এই প্রসঙ্গে। কেউ বলেছেন  কায়ান পুরুষেরা বনে শিকারে গেলে নারীরা ঘরে একা থাকতেন। তখন বন্য প্রাণী গ্রামে এসে নারীদের ওপর হামলা চালাত। বন্যপ্রাণীরা যেহেতু ঘাড় কামড়ে ধরে তাই ঘাড়ের এই রিং নারীদের সুরক্ষা দিত। কিন্তু এখানে প্রশ্ন, শিশুকন্যাদের বেড়ি পরানো হত, শিশুপুত্রদের পরানো হত না কেন? তারা নিশ্চয়ই শিকারে যেত না, ঘরেই থাকত।

কবে ওদের মত হবো !

কেউ বলেছেন সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। কায়ানদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির পাশাপাশি নারীদের সৌন্দর্য, তাঁদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদা এবং বিত্ত বৈভবের পরিচয়ও নাকি বহন করে থাকে এই রিং’গুলি। কিন্তু স্বল্পায়ু হবেন জেনেও কোনও নারী কি স্বেচ্ছায় এই রিং পরতে চাইবেন, যদি বাধ্য না করা হয়!

থাইল্যান্ডে মানব চিড়িয়াখানা

মায়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ী অঞ্চল মায় হং সন, মুয়াং ও চিয়াং দাও গ্রামগুলিতে দেখতে পাওয়া যাবে জিরাফ নারীদের। গ্রামগুলির রাস্তার ধারের ঝুপড়ি দোকানগুলিতে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা কায়ান নারীরা হাতে তৈরী শৌখিন জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিদেশী পর্যটকদের জন্য।

কায়ান নারীদের দেখতেই বিদেশী পর্যটকরা আসেন। পয়সার বিনিময়ে জিরাফ নারীদের সঙ্গে ছবি তোলেন। সে পয়সার প্রায় পুরোটাই নিয়ে নেয় ট্রাভেল এজেন্সি নয়ত গাইড। তবে থাইল্যান্ডে ‘হিউম্যান জু‘-তে থেকে পর্যটকদের সঙ্গে ছবি তোলা  জিরাফ নারীরা মন থেকে মেনে নেন না। তাঁরা এ কথা বারবার জানিয়েছেন প্রশাসনকে। কেউ শোনেনি তাঁদের কথা। এমন কি গ্রামের বাইরে যাওয়ার অধিকার জিরাফ নারীদের নেই। তাঁরা আজ চিড়িয়াখানার জিরাফের মতই বন্দি।

চলছে প্রথা ভাঙার লড়াই, জিতবেন কি কায়ান নারীরা

বর্তমানে কায়ান নারীদের অনেকেই জিরাফ নারী হয়ে মায়ানমার আর থাইল্যান্ডের বিদেশী মুদ্রা আয়ের উৎস হতে চান না। কায়ান সমাজের এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁরা গলার বেড়ি খুলে আর দশটা স্বাভাবিক মেয়ের মত সমাজে মিশে যেতে চান। বেশ কিছু সামাজিক সংগঠন কায়ান নারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

 

 

 

 

ক্যামেরার স্বার্থে হাসি দিয়ে কান্না আড়াল আর কতদিন !

কিন্তু প্রশ্ন হল, সবুজ পাহাড়ের কোলে বসবাস করা কায়ান উপজাতি কি তাদের নারীদের কোনও দিন বুঝতে চেষ্টা করেছে! পড়তে চেষ্টা করেছে তাঁদের মন! তাঁদের যন্ত্রণাকে! যেদিন কায়ানরা তাঁদের নারীদের বুঝবেন, যেদিন তাঁরা তাঁদের নারীদের গলার বেড়ি খুলে দেবেন, সেদিন পৃথিবীর অভিধান থেকে ‘জিরাফ নারী নামে নারীত্বের অবমাননাকারী শব্দ-যুগলের মৃত্যু ঘটবে। আরও কিছুদিন বেশি পৃথিবীকে দেখতে পারবেন কায়ান নারীরা। তারই অপেক্ষায় বুঝি দিন গুনছেন যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখগুলি। সৌজন্যে ওয়াল

About the Author

-

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

%d bloggers like this: