জঙ্গিবাদ একটি সমস্যা এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা !

Share This
Tags

মো. সাইফুজ্জামান রানা

বিংশ শতকের শেষে মানব সমাজের মহা আতংকের নাম ছিলো মরণ ব্যাধি এইচআইভি/এইড্স; যার পরিপূর্ণ নিরাময় এখনো আবিস্কার করতে পারেনি মানুষ। আর আজ অর্থাৎ একবিংশ শতকের সূচনা কাল থেকে মানবকুল আরেক মহা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; যার নাম সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ । এটা পরিষ্কার যে, এই দুটি সহা সংকট সৃস্টির পিছনে মানুষের কম বেশি হাত আছে । কেননা মানুষ জন্মের সময় জঙ্গি বা সন্দ্রাসী হয়ে জন্মায় না। আর মানুষতো এক দিনেও মানুষ হয়ে ওঠেনা। একজন মানব শিশু জস্মের পর থেকে দিনে দিনে মানুষ হয়ে ওঠে বা তাকে মানুষ ক’রে তুলতে হয় কিংবা মানুষ হয়ে উঠতে সহায়তা করতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে কিংবা জঙ্গি আক্রমণ করছে তারাতো এই সমাজেই বেড়ে উঠেছে। তা যদি সত্যি হয় তাহলে আমাদের সামাজিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবতে হবে। কেন এই সমাজের একটি অংশ বা কিছু কিছু লোক জঙ্গিবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছে? তাহলে কি এই সমাজের ভিতরেই রয়েছে জঙ্গিবাদের মূল বীজ?
জঙ্গিবাদের উৎস খুঁজতে হলে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে রাষ্ট্রের দুটি জায়গায়। এক). সমাজের দিকে, দুই). রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে।
সমাজের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে কি দেখতে পাই? বিশেষ করে বাংলাদেশের সমাজিক জীবনে বয়ে যাচ্ছে চরম বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য। এখানে নেই রাজনৈতিক সুস্থ পরিবশে। বৈষম্য বাড়ছে দিনে দিহে হুহু করে। প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অস্থার সংকট প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। প্রশাসন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের না হয়ে কাজ করছে দলীয় স্বার্থে। এখানে এখনো বেশির ভাগ মানুষ লিখতে-পড়তে পারেনা। জ্ঞান বা বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত অংশ সামান্যই। এক দিকে গ্রামীণ দারিদ্রপিড়ীত অসহায় মানুষের দীর্ঘ মিছিল অন্যদিকে সুষ্টিমেয় সুবিধাভোগি অংশ যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কিংবা অর্থ দুটোর মালিক। সমাজবিজ্ঞানি কিংবা মনোবিজ্ঞানি যাদের কথায় বলেন না কেন, তাঁরা বহুকাল থেকে এই কথা বলে চলেছেন যে, ক্রমাগত বৈষম্য, বিচারহিনতা ও বিজ্ঞান শিক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় অন্ধত্বের ফলে সমাজে জন্ম হতে পারে চরম ধ্বংস্বাত্বক মনোভাবাপন্ন মানুষ; যারা সংকীর্ণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের কারণে হয়ে উঠতে পারে ধ্বংস্বাত্বক, আগ্রাসী, সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি। বাংলাদেরে সমাজ বিচারে বৈষম্য, বিচারহিনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও নৈরাজ্য সর্বত্র বিরাজমান। ফলে এখানে জঙ্গিবাদের চাষ এবং পরিচর্যার যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান।
এবার দৃষ্টি দেয়া যাক বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে। বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূলত ডিগ্রী অর্জন এবং প্রদানের উৎসব চলছে- একথা বল্লে কি খুব বেশি বলা হবে? আমরা যারা অভিভাবক তারাতো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সন্তানকে নিয়ে ছুটছি এক শিক্ষকের বাসা থেকে অন্য শিক্ষকের বাসা কিংবা এক কোচিং থেকে অন্য কোচিং এ। কেননা আমার সন্তানকে পরীক্ষায় পেতে হবে গোল্ডেন জিপিএ, ক্লাসে হতে হবে প্রথম । অন্যদিকে যারা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত তারা কি করছেন? বছর বছর শতভাগ পাসের উৎসব করছেন। কি করে শিক্ষার্থীদের শতভাগ পাস নিশ্চিত করা যায় সেই কাজে সদা ব্যস্ত। কোন পক্ষই ভাবছেন না তাদেঁর সন্তানেরা কি শিখছে? পরীক্ষা নামক পুলসিরাত পার হতে পারলেই হলো। শুধ পার হওয়া নয় সবার আগে পার হতে হবে। হতে হবে প্রথম।
শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানিদের মতে শিশুর নানাবিধ অভিজ্ঞতার মাধমে তার ভিতর যে মানবিক গুণাবলি থাকে সেগুলোর বিকাশ লাভ করে। এই গুণাবলি বা মানবিক গুণাবলিগুলো এমনিতে বিকশিত হয় না। এগুলোর বিকাশের জন্য চর্চা করতে হয়। একজন মানব শিশুর ভিতর যে সুপ্ত গুণগুলো রয়েছে যেমন সহনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা, আনন্দ-বেদনা, রাগ-ক্ষোভ, সৃজনশীলতা, নান্দনিকতাবোধ, সৌন্দর্যবোধ, নীতিবোধ, ন্যায়বোধ, সামাজিকীকরণ বা মানবিকতা এগুলো শিশু দিনে দিনে পরিবার, সমাজ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সার্বজনীন উৎসব থেকে অভিজ্ঞতা আর্জনের মাধমে শিখে থাকে। মানবিক ও জ্ঞান নির্ভর সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কি পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করছে? আমাদের স্কুলগুলোতে (শহরের) কি পর্যাপ্ত খেলার মাঠ আছে? আর থাকলেও সেখানে কি নিয়মিত শরীর চর্চা ও খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকে শিশুদের জন্য। তা যদি না থেকে তাহলে শিশুর শরীর যেমন গড়ে উঠছে না তেমনি অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিংবা সহিষ্ণুতা অথবা সামাজিকীকরণ কিভাবে হবে শিশুর? অন্যদিকে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি শিক্ষার্থীর মত প্রকাশ ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ আছে, না এমন কিছু চর্চা হয়; যাতে তার সৃষ্টিশীল গুণাবলি বিকাশ লাভ করবে? পরিবারগুলোতে কি সমাজ কিংবা রাষ্ট্র বিষয়ক ভাবনা বা আলোচনা হয়? ব্যক্তিতন্ত্র ও ভোগবাদ এমন ভাবে বাসা বেধেছে যে, সেখানে সকলের ভালো এই ভাবনা বা আলোচনা ও চর্চা অনুপস্থিত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও আজ সুশাসনের বড়ই অভাব। ফলে একজন শিশুকে যখন শিশু থেকে যুবক ও আরো পরে পূর্ণ মানুষের মর্যাদা লাভের যে পথ অতিক্রম করতে হয়; সেখানে শিশুর মানবিক গুণাবলি বিকাশের সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত। শিশুর বেড়ে উঠার পর্যায়গুলো তার যথাযথ বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত না করে; আমরা যদি পূণাঙ্গ বিকশিত মানুষ আশা করি তাহলে তা কতটা সঙ্গত আশা তা পূর্ণবার ভাবনার দাবি রাখে নিশ্চয়। আমরা যদি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার দিকে তাকায় তাহলে অন্তত একাধিক রকমের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দেখতে পাই। কিন্তু মজার বিষয় হলো বিজ্ঞানি বলেন আর শিক্ষা বিষেষজ্ঞ বলেন সকলেই একমত যে, বয়স অনুসারে শিশুরা প্রায় একই রকম চিন্তা করতে ও শিখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতর মধ্যে যদি একাধিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন সাধারণ, মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যাম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক, এসজিও কর্তৃক পরিচালিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে কি করে একমুখি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব? ভিন্ন পরিবেশ ও শিক্ষাক্রম শিশুর ভাবনাকেও ভিন্ন ভিন্ন খাতে নিয়ে যাবে এবং সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?

দৃষ্টি দিতে বলবো মানুষ তৈরির কারখানাগুলোর দিকে? আমরা কি সমাজের মানুষদের মধ্যে মানবিক বোধের শিক্ষা দিতে পেরেছি? পেরেছি কি নৈতিক শিক্ষা দিতে? সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় সংকীর্ণ ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ রক্ষার মহোৎবস যেখানে চলে সেখানে ন্যায় বিচার ও সুশাসন থাকতে পারেনা। মূলত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় দলবাজীর পরোক্ষ ফল স্বরূপ রাষ্ট্রে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা ও অনাচার। বাংলাদেশর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
একটি সমাজে বা রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় যখন মানুষের মানবিক গুণাবলি বিকাশের সুযোগ থাকেনা; শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাব দেখা দেয়, রাজনৈতিক অবিশ্বাস যখন চরম পর্যায়ে পৌছায় তখন ক্ষমতার বাইরে থাকা গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তিগণ তাদের দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য তৎপরতা শুরু করে। আর সেই তৎপরতা বা চেষ্টা কখনো কখনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গিবাদে রূপ নেয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বে আজ ধর্মীয় জঙ্গিবাদের নামে যা ঘটছে তা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। আর এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য দেশে দেশে কোন না কোন ভাবে রাষ্ট্র তথা প্রশানযন্ত্র প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে দায়ী।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে উদ্ভুত জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলের উপায় কি? আদেও কোন উপায় আছে কি এগুলো সমাজ থেকে নির্মূলের? পুরাপুরি নির্মূল করা সম্ভব কিনা জানি না তবে বন্ধ করা যাবে নিশ্চয়। আপাতত প্রথম কাজ হল আপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করাতে হবে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর দীর্ঘ মেয়াদি ভাবনার জায়গায় মানুষ তৈরির কারখানাগুলো যেমন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুর মানবিক গুণাবিল বিকাশের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আর এই সংস্কার এখনই করতে হবে তা না হলে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আপাতত বন্ধু করা গেলেও বার বার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। স্থায়ী সমাধানে শিক্ষা সংস্কারের বিকল্প আছে কি?

লেখক: শিক্ষা গবেষক ও সাংস্কৃতিককর্মী।

About the Author

-

%d bloggers like this: